অটিস্টিক সন্তান কি মায়ের পাপের ফল?

বেশ অনেক বছর হলো। বিটিভিতে তখন প্যাকেজ নাটকের জোয়ার চলছে। বেশিরভাগ নাটকই সেখানে তদবিরে প্রচার হতো। তখন মানহীন একাধিক ঈদের নাটক প্রসঙ্গে প্রায়াত বরেণ্য নাট্য ব্যক্তিত্ব আব্দুল্লাহ আল মামুন একটি সাক্ষাতকারে বলেছিলেন এইসব নাটক কারা বানায়? এইসব নির্মাতার জন্ম হয়েছে কার ঔরশে? তখন এই কথাটা বেশ আঘাত করেছিল আমায়। কারনটা হলো এদের জন্ম কার ঔরশে হয়েছে কথাটা অনেক বেশি নেগেটিভ মনে হয়েছিল। কিন্তু আজকের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে মামুন ভাইয়ের সেই কথাটাই মনে হচ্ছে অনেক কম বলা হয়েছিল। নাটকের নামে এসব হচ্ছে টা কি আসলে? উত্তরায় কয়েকজন শিল্পীর যে সিন্ডিকেটের কথা আলোচনা, কানাঘোষা হয়, সেই সিন্ডিকেট ইদানীং অনেক বেশি ক্ষমতাবান হয়ে পড়েছে। এদের পরিচালক প্রয়োজন হয় না একেবারেই। নিজেরাই গল্প ভাবে, নিজেরাই ডিরেকশান দেয় আন অফিসিয়ালি, নিজেরাই ইচ্ছে মতো টাকার ভাগ বাটোয়ারা করে নেই। তারাই সিদ্ধান্ত দেয় কার কয়টা নাটকে কে কবে সিডিউল দিবে। আর এদেরকে চোষার জন্য কিছু নির্মাতা নামধারী কীট পতঙ্গ জন্ম নিয়েছে। শুটিং সেটে এদের কোনো কাজ থাকে না, শুধু জোরে একবার একশান বলতে পারলেই ডিরেক্টর হয়ে যায় এরা। এরা না বুঝে স্ক্রিপ্ট, না বুঝে শট, না বুঝে ডিরেকশান। আর এদেরকে লুফে নেয়ার জন্য ,উখিয়ে বসে থাকে কিছু চ্যানেল এবং এজেন্সীর বেনিয়ার দল। ভাল নির্মাতারা আজ হিমঘরে চলে গেছেন। এদের কোনো নীতি নৈতিকতা বলতে কিছুই নেই। শুধুই টাকা কামানোর মিশনে নেমে এই ইন্ডাস্ট্রির বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে এরা। তার সর্বশেষ উদাহরণ হলো সিএমভির ব্যানারে নির্মিত এবারের ইদের একটি নাটক। নাটকে স্পেশাল চাইল্ড যাকে আমরা অশুদ্ধ করে বিকলাঙ্গ বা পঙ্গু বলতে বেশি আনন্দবোধ করি। এইযে আনন্দ বোধ করি সেখান থেকেই তৈরি এই নাটকটি। পরিচালক রুবেল হাসান। বিভিন্ন শুটিং স্পটে গিয়ে দেখা যায় তাকে নাটকের কিছুই করতে হচ্ছে না, তথাকথিত উত্তরা সিন্ডিকেটের নায়কেরাই শট ঠিক করে নিজেরাই এক্টিং করে বেরিয়ে যাচ্ছেন, পরিচালক তৃপ্তির হাসি হেসে অভিনেতাকে বস বস করে বাহবা দিচ্ছেন। পরিচালকের কাজ যখন এই পর্যায়ে নামে তখন তার একটি নাটকের পান্ডুলিপি বুঝবার ক্ষমতা না থাকারই কথা। কারন এই জাতীয় সিন্ডিকেট নির্মাতাদের পান্ডুলিপির কোনো প্রয়োজনই হয় না আসলে। নায়ক দয়া করে সিডিউল দেন, সেই নায়কই তার পছন্দের নায়িকা বাছাই করেন, সেই নায়জকেরই গল্প ভাবনা এবং শুটিং স্পটে গিয়ে ইম্প্রোভাইজেশান। এমনকি শুটিং শেষ হয়ে যাবার পরেও পরিচালক সেই নাটকের নাম বলতে পারেন না। ফিরে আসা যাক আসল প্রসঙ্গে।

যে নাটকটির কথা বলছিলাম, সেখানে একটা অটিস্টিক শিশুর মা কে বলা হচ্ছে যে মায়ের পাপের ফল এই সন্তান। একবার ভাবাও হয়নি পৃথিবীতে লক্ষ কোটি অটিস্টিক মাকে চরিত্রহীন তকমা লাগিয়ে দেয়া হলো এই একটি কথা দিয়েই।এখানে বেশ কয়েকটি প্রশ্ন এসে যায়১। নাট্যকার ছিল কি এই নাটকের?২। নাট্যকার কি এটাকে ইসলামী নাটকের ফ্লেভার দিয়ে ভাইরাল হতে চেয়েছেন?৩। পরিচালক কি সেই স্ক্রিপ্ট পড়েছিলেন বা এডিট টেবিলে দেখেছেন সেটা?৪। আফরান নিশো এবং মেহজাবিন কি এই সংলাপ দিয়েছেন নাকি ইন্ডিয়া থেকে তাদের বদলে অন্য কারো কণ্ঠ ডাবিং করে জোড়া লাগানো হয়েছে?জানি এই প্রশ্নগুলোর একটারও যথাযথ উত্তর পাওয়া যাবে না কারন, এখন বেশিরভাগ শিল্পীই শোনা যায় কাজ করেন টাকার জন্য। আর কত টাকা চাই আপনাদের? কত টাকা হলে এগুলো বাছ বিচার করে কাজ করবেন? আপনারা সাধারন দর্শকদের কাছে আইডল। আপনারা নাটকে হোক, ব্যক্তি জীবনে হোক যে কথাই বলেন, দর্শক ভক্তরা সেগুলো বাছ বিচার ছাড়াই গিলে ফেলে এবং নিজের জীবনে সেটা প্রয়োগ করে।এখন যদি কোনো স্বামী তার অটিস্টিক বাচ্চার জন্য বউকে দায়ী করে মারধোর করে বা তালাক দেয় বা সেই সংসারে নতুন অশান্তি তৈরি হয় তাহলে এর দায়ভার কে নিবে?উত্তরগুলি দিয়ে যাবেন নতুবা আল্লাহর ওয়াস্তে টাকা কামানোর বহু যায়গা আছে সেখানে গিয়ে টাকা কামান । কেউ বাধা দিতে আসবে না। একটা স্পেশাল চাইল্ডকে মানুষ করতে একজন বাবা মায়ের যে কষ্ট পোহাতে হয় তাকে আপনারা এক কথা জাস্টহিফাই করে দিলেন সেটা পাপের ফল। হ্যালো মিস্টারেরা আপনাদের বলছি, নাটক করাও কিন্তু পাপ। নাটকে এইযে একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরছেন এগুলা পাপ এবং হারাম। এগুলা করে যে টাকা কামান সেটাও অবৈধ নিশ্চয়। পাপ পূণ্যের বিচার টা অন্যের বেলায় করতে না এসে নিজেরা যে সত্যিকারের পাপ করছেন সেটা থেকে তওবা করে ৬ চিল্লাই চলে যান। এগুলা থামান, নয়তো প্রকৃতিই আপনাদের থামিয়ে দিবে। আর আমাদের নাটকের বড় বড় সংগঠনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, এই নাটকের সাথে যারা যেভাবে যুক্ত বিশেষ করে নাট্যকার, পরিচালক, প্রযোজক এবং অভিনেতা অভিনেত্রীদের শাস্তির আওতায় আনেন। পচন মগজে উঠে গেলে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কেটেও কাজে দিবে না। মাথাটাকেই তখন কেটে ফেলতে হবে।

মতামত

শিমুল সরকার, নাট্যকার, নির্মাতা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here