একজন বিদগ্ধ-বহুমাত্রিক শিল্পী রফিকুন নবী (ভিডিও)

একজন বিদগ্ধ-বহুমাত্রিক শিল্পী রফিকুন নবী (ভিডিও)

চিত্রশিল্পী রফিকুন নবীর আজ জন্মদিন। ১৯৪৩ সালের ২৮ নভেম্বর রাজশাহী বিভাগের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বাবা রশীদুন নবী ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। মা আনোয়ারা বেগম ছিলেন জমিদার পরিবারের সন্তান।

পুলিশ অফিসার বাবার বদলির চাকরির সুবাদে রফিকুন নবীর শৈশব ও কৈশোর কাটে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। পঞ্চাশ দশকের মাঝামাঝিতে ঢাকায় স্থায়ী হন তারা। পুরান ঢাকাতেই কৈশোর ও যৌবনের অনেকটা সময় কাটে রফিকুন নবীর।

১৯৫০ এর মাঝামাঝিতে স্কুলে ভর্তি হন তিনি। পুরান ঢাকার পোগোজ হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৫৯ সালে ঢাকার সরকারি আর্ট কলেজে ভর্তি হন তিনি। এখানে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, কামরুল হাসানসহ খ্যাতিমান দিকপালের সান্নিধ্যে থেকে পড়াশোনা করেন।

আর্ট কলেজে প্রথম বর্ষে থাকতে নিজের আঁকা ছবি প্রথম বিক্রি করেন ১৫ টাকায়। স্থানীয় সংবাদপত্রে রেখাচিত্র এঁকে এবং বুক কভার ইলাস্ট্রেশন করে পরিচিতি লাভ করেন দ্বিতীয় বর্ষেই। ১৯৬২ সালে এশিয়া ফাউন্ডেশনের বৃত্তি লাভ করেন তিনি। `৬৪ সালে স্নাতক পাশ করেন।

পড়াশোনা শেষ করে রফিকুন নবী সে সময়ে ঢাকার প্রথম সারির পত্রিকাগুলিতে নিয়মিত কাজ শুরু করেন। নিয়মিত কার্টুন আঁকতেন সাপ্তাহিক পূর্বদেশ পত্রিকায় কবি আবদুল গনি হাজারির কলাম ‘কালো পেঁচার ডায়েরী’তে। ১৯৬৪ সালের ৩ আগস্ট ঢাকা আর্ট কলেজের শিক্ষক হিসেবে জীবন শুরু করেন তিনি।

আর্ট কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রদের নিয়ে তার শিক্ষকতা জীবনের শুরু হয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ঢাকায় থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অর্থ, কাপড় ও খাদ্য সংগ্রহ করেন তিনি। ১৯৭৩ সালে গ্রীক সরকারের পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন বৃত্তি নিয়ে তিনি ভর্তি হলেন গ্রীসের এথেন্স স্কুল অব ফাইন আর্ট-এ।

পড়াশোনা করেন প্রিন্ট মেকিংয়ের ওপর। ১৯৭৬ সালে দেশে ফিরে আসেন। শিক্ষক থেকে ধীরে ধীরে প্রভাষক, সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপকের পদে অধিষ্ঠিত হন৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অফ ফাইন আর্টস-এর ড্রইঙ ও পেইন্টিং বিভাগে প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন ১৯৮৮ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত।

১৯৯৪ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন এই ইন্সটিটিউটের পরিচালক। বর্তমানে ফ্রিল্যান্স আর্টিস্ট হিসাবে কাজ করছেন। ১৯৭৮ সালের ১৭ মে টোকাই শিরোনামে প্রথম স্ট্রিপ কার্টুনটি ছাপা হয় বিচিত্রার প্রারম্ভিক সংখ্যায়। প্রথম কার্টুনে টোকাই একজন বড় কর্মকর্তা বসে আছে তার বানানো অফিসে। রাস্তার ইট দিয়ে তৈরি একটি টেবিলে।

প্রথম কার্টুনেই বিপুল জনপ্রিয়তা পাওয়া টোকাই নিয়মিত বিচিত্রায় ছাপা হয়। ২০০০ সাল থেকে সাপ্তাহিক ২০০০-এ শুরু হয় আঁকা হলেও ২০০৪ সালের দিকে নিয়মিত টোকাই আঁকা বন্ধ করেন তিনি। টোকাইয়ের মাথায় টাক, কখনও গুটিকয়েক চুল, খাটো চেক লুঙ্গি মোটা পেটে বাঁধা৷ কখনো কাঁধে বস্তা।

`৭৮-`৭৯-এ ভোটের সময় বিলি করা জামা পরেছিল টোকাই, সেই জামাটি ছিল ওর থেকে অনেক বড় আকারের৷ থাকে রাস্তার ডাস্টবিনের পাশে, ফুটপাতে, ফেলে রাখা কংক্রিটের পাইপের ভেতর, পার্কের বেঞ্চিতে, ভাঙা দেয়ালের পাশে, কাঠের গুঁড়িতে, ঠেলা গাড়ির ওপরে, ইটের ওপর মাথা পেতে৷ তার পাশে থাকে কুকুর, কাক৷ কথা বলে কাক, গরু, ছাগল, মশার সাথে৷ কথা বলে মানুষের সাথেও।

রফিকুন নবী শিল্পকলায় অবদানের জন্য ১৯৯৩ সালে একুশে পদক লাভ করেন। এছাড়া তিনি চারুকলায় জাতীয় সম্মাননা শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার, বুক-কভার ডিজাইনের জন্য ১৩ বার ন্যাশনাল একাডেমি পুরস্কার লাভ করেছেন৷ ২০০৮ সালে তার আঁকা খরা শীর্ষক ছবির জন্য ৮০টি দেশের ৩০০ জন চিত্রশিল্পীর মধ্যে `এক্সিলেন্ট আর্টিস্টস অব দ্য ওয়ার্ল্ড` হিসেবে মনোনীত হন। তিনি ২০১৫ সালের জন্য শেলটেক কর্তৃক প্রদত্ত শেলটেক পদক লাভ করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here