একসময় কমিউনিস্ট পার্টি করতেন মৃণাল সেন(ভিডিও)

একসময় কমিউনিস্ট পার্টি করতেন মৃণাল সেন

মৃণাল সেন ছিলেন প্রখ্যাত ভারতীয় বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও লেখক। ১৯২৩ সালে মৃণাল সেন তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত পূর্ব বঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশ) ফরিদপুরের একটি শহরে বৈদ্যব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ফরিদপুরে থাকাকালীন সময়ে তিনি সেখানেই উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি পড়াশোনার জন্য কলকাতায় আসেন এবং স্কটিশ চার্চ কলেজ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা পড়াশোনা করেন। ছাত্রাবস্থায় তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক শাখার সঙ্গে যুক্ত হন। যদিও তিনি কখনও কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন নি। চল্লিশের দশকে তিনি সমাজবাদী সংস্থা আইপিটিএর (ইন্ডিয়ান পিপ্লস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশন) সঙ্গে যুক্ত হন এবং এর মাধ্যমে তিনি সমমনভাবাপন্ন মানুষদের কাছাকাছি আসেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করবার পর তিনি একজন সাংবাদিক, একজন ওষুধ বিপননকারী এবং চলচ্চিত্রে শব্দ কলাকুশলী হিসাবে কাজ করেন।

১৯৫৫ সালে মৃণাল সেনের প্রথম পরিচালিত ছবি রাত-ভোর মুক্তি পায়। এই ছবিটি বেশি সাফল্য পায় নি। তার দ্বিতীয় ছবি নীল আকাশের নিচে তাকে স্থানীয় পরিচিতি এনে দেয়। তার তৃতীয় ছবি বাইশে শ্রাবণ থেকে তিনি আন্তর্জাতিক পরিচিতি পান।

১৯৬৯ সালে তার পরিচালিত ছবি ভুবন সোম মুক্তি পায়। এই ছবিতে বিখ্যাত অভিনেতা উৎপল দত্ত অভিনয় করেছিলেন। এই ছবিটি অনেকের মতে মৃণাল সেনের শ্রেষ্ঠ ছবি। তার কলকাতা ট্রিলোজি অর্থাৎ ইন্টারভিউ (১৯৭১), কলকাতা ৭১ (১৯৭২) এবং পদাতিক (১৯৭৩) ছবি তিনটির মাধ্যমে তিনি তৎকালীন কলকাতার অস্থির অবস্থাকে তুলে ধরেছিলেন। মধ্যবিত্ত সমাজের নীতিবোধকে মৃণাল সেন তুলে ধরেন তার খুবই প্রশংসিত দুটি ছবি এক দিন প্রতিদিন (১৯৭৯) এবং খারিজ (১৯৮২) এর মাধ্যমে। খারিজ ১৯৮৩ সালের কান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষ জুরি পুরস্কার পেয়েছিল। ১৯৮০ সালের চলচ্চিত্র আকালের সন্ধানে। এই ছবিতে দেখানো হয়েছিল একটি চলচ্চিত্র কলাকুশলীদলের একটি গ্রামে গিয়ে ১৯৪৩ খ্রীষ্টাব্দের দুর্ভিক্ষের উপর একটি চলচ্চিত্র তৈরির কাহিনী। কিভাবে ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষের কাল্পনিক কাহিনী মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় সেই গ্রামের সাধারণ মানুষদের সাথে সেটাই ছিল এই চলচ্চিত্রের সারমর্ম। আকালের সন্ধানে ১৯৮১ সালের বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষ জুরি পুরস্কার হিসাবে রুপোর ভালুক জয় করে। মৃণাল সেনের পরবর্তীকালের ছবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য মহাপৃথিবী (১৯৯২) এবং অন্তরীন (১৯৯৪)। এখনও অবধি তার শেষ ছবি আমার ভুবন মুক্তি পায় ২০০২ সালে।

মৃণাল সেন বাংলা ভাষা ছাড়াও হিন্দি, ওড়িয়া ও তেলুগু ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। ১৯৬৬ সালে ওড়িয়া ভাষায় নির্মাণ করেন মাটির মনীষ, যা কালীন্দিচরণ পাণিগ্রাহীর গল্প অবলম্বনে নির্মিত হয়। ১৯৬৯ এ বনফুলের কাহিনী অবলম্বনে হিন্দি ভাষায় নির্মাণ করে ভুবন সোম। ১৯৭৭ সালে প্রেম চন্দের গল্প অবলম্বনে তেলুগু ভাষায় নির্মাণ করেন ওকা উরি কথা। ১৯৮৫ সালে নির্মাণ করেন জেনেসিস, যা হিন্দি, ফরাসি ও ইংরেজি তিনটি ভাষায় তৈরি হয়।

তাঁর পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে–

রাত-ভোর- ১৯৫৫ (বাংলা), নীল আকাশের নিচে- ১৯৫৮ (বাংলা), বাইশে শ্রাবণ- ১৯৬০ (বাংলা),  পুনশ্চ- ১৯৬১ (বাংলা),অবশেষে- ১৯৬৩ (বাংলা), প্রতিনিধী- ১৯৬৪ (বাংলা), আকাশ কুসুম- ১৯৬৫ (বাংলা), কাঁচ কাটা হীরে- ১৯৬৫ (হিন্দি), মাটির মনিষা- ১৯৬৬ (ওড়িয়া), জোরাদিঘির চৌধুরী পরিবার- ১৯৬৬ (ওড়িয়া), ভুবন সোম- ১৯৬৯ (হিন্দি), ইন্টারভিউ- ১৯৭০ (বাংলা), এক আধুরি কাহানি- ১৯৭১ (হিন্দি), কলকাতা ৭১- ১৯৭২ (বাংলা),  পদাতিক- ১৯৭৩  (বাংলা), কোরাস- ১৯৭৪ (বাংলা),মৃগয়া- ১৯৭৬ (হিন্দি), ওকা উরি কাথা- ১৯৭৭(তেলেগু), পরশুরাম- ১৯৭৮  (বাংলা), এক দিন প্রতিদিন- ১৯৭৯ (বাংলা), আকালের সন্ধানে- ১৯৮০ (বাংলা), চলচ্চিত্র – ১৯৮১(বাংলা), খারিজ- ১৯৮২ (বাংলা), কান্দাহার- ১৯৮৩  (হিন্দি), জেনেসিস- ১৯৮৬ (হিন্দি), এক দিন আচানক- ১৯৮৯ (হিন্দি), মহাপৃথিবী- ১৯৯১(বাংলা), অন্তরীণ- ১৯৯৩ (বাংলা), আমার ভুবন- ২০০২  (বাংলা) উল্লেখযোগ্য ।    

গ্রন্থতালিকার মধ্যে রয়েছে —

(১) জনৈকের জীবনচরিত (১৯৪৬, নিউ এজ) – অনুবাদক । (২)চার্লি চ্যাপলিন (১৯৫৩, নিউ এজ)। (৩)ভিউস অন সিনেমা (১৯৭৭, ইংরেজি)। (৪)সিনেমা, আধুনিকতা (১৯৯২, প্রতিক্ষণ প্রকাশনী) । (৫)মন্টেজ: লাইফ, পলিটিক্স, সিনেমা (২০০২, ইংরেজি, সীগাল বুক্স)। (৬)অলোয়েজ বিইঙ্গ বর্ন (২০০৪, ইংরেজি, স্টেলার পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড)

চিত্রনাট্য করেছেন —

দ্য রুইন্স (১৯৮৪, ইংরেজি, সীগাল বুক্স) ,   অকালের সন্ধানে (১৯৮২, বিভব),  ইন সার্চ অব ফেমিন (১৯৮৫, ইংরেজি, সীগাল বুক্স),   অন্তরীণ (১৯৯৭, বিতর্ক),  দ্য অ্যাবসেন্স ট্রিলজি (১৯৯৯, সীগাল বুক্স),   চিত্রনাট্য (২০০৪, পুনশ্চ),   আমার ভুবন (২০০৪, দে’জ পাবলিশিং) ।

মৃণাল সেন পরিচালিত চলচ্চিত্রগুলি প্রায় সবকটি বড় চলচ্চিত্র উৎসব থেকে পুরস্কার জয় করেছে। ভারত এবং ভারতের বাইরের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সাম্মানিক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করেছে। তিনি ইন্টারন্যাশন্যাল ফেডারেশন অফ দি ফিল্ম সোসাইটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন।

•          ১৯৮১ সালে তিনি ভারত সরকার দ্বারা পদ্মভূষণ পুরস্কার লাভ করেন।

•          ২০০৫ সালে তিনি দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার পান।

•          তিনি ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ অবধি ভারতীয় সংসদের সাম্মানিক সদস্যপদ লাভ করেন।

•          ফরাসি সরকার তাকে কম্যান্ডার অফ দি অর্ডার অফ আর্টস অ্যান্ড লেটারস (Ordre des Arts et des Lettres ) সম্মানে সম্মানিত করেন। এই সম্মান ফ্রান্সের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান।

•          ২০০০ সালে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তাকে অর্ডার অফ ফ্রেন্ডশিপ সম্মানে ভূষিত করেন।

আজ ৩০ ডিসেম্বর । ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসের রবিবারের আজকের দিনে  সকাল বেলায় নিজ বাসভবনে ৯৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন মৃণাল সেন । বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও লেখক মৃণাল সেনের প্রয়াণ দিবসে বিনোদন প্রতিদিন পরিবারের গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি । 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here