টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রিতে আদৌ শৃঙ্খলা ফিরবে কি?

সকাল ১০টায় শুটিং শুরু হয়ে শেষ হবে রাত ১১টায়। শুটিং শুরুর সব প্রস্তুতি সকাল ১০টার আগেই শেষ করতে হবে। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, শিল্পীর অসুস্থতাসহ বিশেষ কারণে নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে কাজ শেষ করা যাবে। নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ চাইলে ক্ষতিপূরণের আবেদন করতে পারবে। এই নোটিশের আগে আরও একটি নোটিশ দেয়া হয়েছিল যেখানে শুটিং শুরুর কোনো সময় উল্লেখ ছিল না। তাতেই ক্ষোভে ফেটে পড়তে দেখা যায় নির্মাতাদের। তাদের অনেকের অভিযোগ পুরো ইন্ডাস্ট্রিটাই অভিনয় শিল্পী শাসিত হয়ে পড়েছে। তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এটাও বলেছেন এফটিপিওতেও যারা আছেন তাদের অধিকাংশ নীতি নির্ধারক অভিনেতা। দুদিন যেতে না যেতেই নোটিশে পরিবর্তন আসে। আগের নোটিশ পালটে যায়। নতুন নোটিশে শুটিং শুরুর সময় উল্লেখে করা হয়। কিন্তু অনেক নির্মাতার দাবি শিল্প কখনও ধরাবাধা সময়ে করা যায় না। কম বেশি সেটা নির্মাতার স্বাধীনতা হওয়া উচিত। শুধু এই ক্ষেত্রে একটা নিয়ম হতে পারে এখন যেমন কাজের সময় ১৩ ঘন্টা করা হয়েছে সেটি প্রয়োজনে ১২ ঘন্টা করে, ওভারটাইম বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। সময় নির্ধারন করবেন নির্মাতা এবং প্রযোজক, আর কেউ নন। অনেকদিন থেকেই নানা দাবি উঠে

আসলেও তেমন কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়নি।

বছর পাঁচেক আগে নিয়ম করা হয়েছিল নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টিভি নাটকের শুটিং শেষ করার। কিন্তু কিছুদিন পর সে নিয়ম মানেননি কয়েকজন নির্মাতা ও শিল্পী। দুই বছর পর গভীর রাত পর্যন্ত শুটিং নিয়ে আবার শিল্পীরা সোচ্চার হন। তখন ছোট পর্দার সংগঠনগুলো সিদ্ধান্ত নেয়, শুটিংয়ের আগে সবাইকে চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে। এবারও পুরোনো চিত্র। কিছুদিন সব ঠিকঠাক চলে। তারপর যেমন ছিল তাই হয়ে যায়। আর তাই আবার কড়া বার্তা দিয়ে নতুন করে শুটিংয়ের এই সময় বেঁধে দিয়েছে ফেডারেশন অব টেলিভিশন প্রফেশনালস অর্গানাইজেশন (এফটিপিও)।

এত দিনেও কেন শুটিং শৃঙ্খলায় আনা গেল না? কেন বারবার একই বিষয়ে নোটিশ দিতে হচ্ছে? এফটিপিও চেয়ারম্যান মামুনুর রশীদ বলেন, ‘আগে থেকেই আমাদের নিয়ম ছিল। কিছু শিল্পী বিলম্বে আসে শুনেছি। এটা নিয়ে অভিযোগ আছে। সবাইকে বলব, সতর্ক হতে। নিয়মের মধ্যে আসা দরকার। গভীর রাত পর্যন্ত শুটিং হলে সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়তে হয় টেকনিশিয়ানদের। দেখা যায়, অভিনয়শিল্পীর পরের দিন কাজ নেই কিন্তু লাইট, ক্যামেরা, প্রোডাকশনের ছেলেদের সকালে অন্য শুটিংয়ে যেতে হয়। আমরা সবাই মিলে একটা পরিবার, এটা শুধু বললেই হবে না, সবার কষ্ট সবাইকে বুঝতে হবে।’

এফটিপিওর নোটিশে কিছু ফাঁকফোকর রয়েছে বলে মন্তব্য করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরম অনেকেই। রাহাত কবির নামের একজন পরিচালক ফেসবুকে নিজের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। তিনি মনে করেন, পরিচালকদের বাধ্য হয়েই গভীর রাত পর্যন্ত শুটিং করতে হয়। নোটিশ শেয়ার করে তিনি লিখেছেন, ‘যাহারা ঠিক টাইমে সেটে এসে সহযোগিতা করছে না, তাদের জন্যও একটা নোটিশ জারি করেন না কেন?’ এই পোস্টের নিচে নির্মাতা সরদার রোকন লিখেছেন, ‘নিকেতন হলো একটা নোটিশ বোর্ড, সেই নোটিশ বোর্ড আমাদের মতো নির্মাতাকে নোটিশটা দেয়, এই হলো নিকেতনের কাজ, কে নেবে তাদের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত, সেই সাহস কার আছে?’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অনেক নির্মাতা বলেছেন, শুধু হাতে গোনা কিছু শিল্পী নিয়মের ধার ধারেন না। তাঁদের কাছে পরিচালকসহ পুরো টিম অসহায়। তাঁরা কেবল আসতেই দেরি করেন না, ফাঁকফোকর বের করে হুট করে শুটিং থেকে চলেও যান।

নির্মাতা শামীম রেজা জুয়েল ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন –

”একজন নির্মাতা হিসেবে আমি জানতে চাই আমার সংগঠন ডিরেক্টরস গিল্ড এর কাছে, কাদের স্বার্থে এই ধরনের সিদ্বান্ত! আপনারা কি নির্মাতাদের স্বার্থের জন্য কাজ করেন নাকি অন্য সংগঠনের সাথে জ্বী ভাই, ইয়েস ভাই করেন ? আপনারা আমাদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আমাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য কাজ না করে শুধুমাত্র অন্যান্য সংগঠনের সিদ্বান্ত বাস্তবায়ন করার জন্য নোটিশে সাইন করেন। শুটিং শেষ করার টাইম উল্লেখ করা আছে, কিন্তু আর্টিস্ট সঠিক সময়ে সেটে উপস্থিত থাকতে হবে সেটা উল্লেখ করা নাই, বাহ কি চমৎকার, এখন কোনো নির্মাতা কোনো নেতাকে প্রশ্ন করলে এই বিষয়ে তিনি আপনাকে নির্লজ্জ্বর মতো নিজেকে অতি চালাক ভেবে বলবে আর্টিস্ট সেটে আসার টাইম কন্টাক্ট পেপারে উল্লেখ করে নিবেন । আরে ভাই নেতা, আপনি তো এইটুকু জানেন যে কিছু আর্টিস্ট সেটে টাইমলি আসে না বলে ই অনেক নির্মাতাকে লেট নাইট শুটিং করতে হয় এই বিষয়টি ওপেন সিক্রেট । তাই আগে তো আর্টিস্ট সেটে আসার টাইম ঠিক করবেন, তারপর যাওয়ার টাইম বা শুটিং শেষ করার টাইম। এই সমস্ত ডিসিশন দেখেলে মনে হয় ডিরেক্টরস গিল্ড অন্য সংগঠনগুলোর মুখপাত্র মাত্র, পাওয়ার লেস, ftpo চিঠিতে শুটিং শেষ করার টাইম উল্লেখ করলে শুটিং শুরু করার টাইম ও উল্লেখ করে দিবেন আশা করি। এবং ডিরেক্টর কল টাইমে সেটে আর্টিস্ট উপস্থিত না থাকলে তার বিরুদ্ধে কি ধরনের সিদ্বান্ত নিবেন সেটাও উল্লেখ করে দিলে আমাদের কাছে এই টাইপ নোটিসের ভ্যালু আছে, অন্যথায় আমরা এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারছি না বলে দুঃখিত।

বি: দ্রঃ ডিরেক্টরস গিল্ড’র সম্মানিত সাধারণ সদস্যদের মতামত প্রকাশ করার সকল মাধ্যমগুলো যেমন Whatsapp group ,Facebook page ম্যাসেঞ্জার গ্রুপ ইত্যাদি বন্ধ করে রাখার কারণে আমি আমার মতামত নিজের ফেসবুক পেজ এ প্রকাশ করতে বাধ্য হলাম।”

এফটিপিওর মহাসচিব ও ডিরেক্টর গিল্ডের সভাপতি সালাউদ্দিন লাভলু বলেন, ‘নোটিশ না দেখে কথা বলা ঠিক নয়। হুট করে কোনো কিছু না বুঝে ফেসবুকে দেওয়াটাও যথার্থ নয়। মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ এগুলো লিখেছেন। এ বিষয়ে বোঝার কোনো কিছু থাকলে তাঁরা সবাই আমাদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। সবার স্বার্থেই আমরা কাজ করছি।’ তিনি আরও বলেন,‘আট-দশজনের মতো শিল্পী রয়েছেন, যাঁরা দেরি করে শুটিং সেটে আসেন। তখন ডিরেক্টররা কোনো উপায় না পেয়ে গভীর রাত পর্যন্ত শুটিং করেন। আমরা উল্লেখ করেছি, এবার নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে, শিল্পী বা কলাকুশলী যাঁর কারণেই শুটিং ক্ষতিগ্রস্ত হোক, তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ হলে সাংগঠনিকভাবে আমরা ব্যবস্থা নেব।’

স্বপ্নিল শুটিং বাড়ির মালিক আবদুল আলীম গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘আমরা অকারণে গভীর রাত পর্যন্ত শুটিংয়ের বিপক্ষে। এটা আমাদের জন্য কষ্টকর। সবাইকে বলব, আমাদের মতো গরিবদের সঙ্গে ঝামেলা না করে লাখ টাকার আর্টিস্টদের আগে শুটিংয়ে নিয়ে আসেন।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here