পদ্মা নদীর মাঝির স্রষ্ঠা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিন আজ

0
136
পদ্মা নদীর মাঝির স্রষ্ঠা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিন আজ

কালজয়ী কথাসাহিত্যিক  মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিন আজ।  ১৯০৮ সালের আজকের এই দিনে (১৯ মে) তাঁর জন্ম। তাঁর আসল নাম প্রবোধকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বাংলা সাহিত্যে যে অন্ধকার নেমে এসেছিলো, সে আধার কাটাতে যে কয়েকজন লেখকের জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়েছে বাংলা সাহিত্য তার মধ্যে মানিক বন্দোপাধ্যায় অন্যতম।

এক জীবনে মানুষের অসামান্য হওয়ার জন্য যত গুন থাকা দরকার মানিক বন্দোপাধ্যায়ের জীবনে সেই সব গুণাবলীই বিদ্যমান ছিল। মানিক বন্দোপাধ্যায় তাঁর সাহিত্যের মাধ্যমে সব সময় সাধারণ মানুষের জীবন তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।  মূলত মধ্যবিত্ত সমাজের মানুষের বাস্তবতা, শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম নিয়েই তিনি বেশি লিখতেন।   জীবনের ছোট ছোট অংশগুলো একত্রিত করে তাঁর মধ্যে তিনি পূর্ণতা খুঁজতেন। এটিই তাঁর প্রধান গুন ছিল এবং লেখক হয়ে উঠার পেছনে   ছিল সবচেয়ে বড় শক্তি। মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেয়া মানিক বন্দোপাধ্যায়ের পৈতৃক বাড়ি ঢাকার বিক্রমপুরে। কিন্তু চাকরি সূত্রে তাঁর বাবাকে যেতে হয়েছিল বিহারে; আর সেকারণেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এর জন্ম হয় বিহারের সাওতাল পরগনা, যা বর্তমান ঝাড়খণ্ড রাজ্যের দুমকা শহর নামে পরিচিত। তবে তাঁর শৈশব ও কৈশোর কাল কেটেছে তৎকালীন পূর্ববঙ্গে। পূর্ববঙ্গের নদীনালা, খালবিল, প্রকৃতি , সেখানকার মানুষ, এসবের মধ্যেই তিনি বড় হয়ে ওঠেন। তাই সেই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের কথা, জীবন, পারিপার্শ্বিক চিত্রগুলো তার হৃদয়ে গেঁথে যায়। যা পরবর্তীতে তাঁর লিখনিতে ফুটে উঠে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিন আজ
ছবি কৃতজ্ঞতা – মিতা মেহেদী

জীবনের প্রথমভাগে তিনি ফ্রয়েডীয় মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। এছাড়া মার্কসবাদও তাঁকে যথেষ্ট প্রভাবিত করেছিল। তাঁর অধিকাংশ রচনাতেই এই দুই মতবাদের নিবিড় প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

তাঁর লেখার শুরুটাও ছিল বেশ মজার।  কলেজ ক্যান্টিনে একদিন আড্ডা দেওয়া অবস্থায় এক বন্ধুর সঙ্গে বাজি ধরেন তিনি তাঁর লেখা গল্প বিচিত্রায় ছাপাবেন। তখন কলকাতায় বিচিত্রা পত্রিকা ছিল অত্যন্ত বিখ্যাত। খ্যাতিমান কবি, লেখকরাই সেখানে লিখতেন। বন্ধুর সঙ্গে বাজি ধরে তিনি লিখে ফেললেন তার প্রথম গল্প ‘অতসী মামী’। পরে গল্পটি বিচিত্রার সম্পাদক বরাবর পাঠিয়ে দেন। গল্পের শেষে লেখক নাম স্বাক্ষর করেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। পাঠানোর চার মাস পর বিচিত্রায় গল্পটি ছাপা হয়। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই গল্পটি পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করে। সেসময়ের লেখকদের কাছে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নামটি পরিচিত হয়ে ওঠে। এরপর থেকে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত লিখতে শুরু করেন তিনি। আর এই সাহিত্যচর্চার কারণে তাঁর একাডেমিক পড়াশোনায় আর এগোতে পারেননি। পরে সাহিত্য রচনাকেই তিনি তাঁর মূল পেশা হিসেবে বেছে নেন।

মাত্র ৪৮ বছরের জীবনে অর্ধশতাধিক উপন্যাস ও ২২৪টি গল্প তিনি রচনা করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থ হলো, জননী, দিবারাত্রির কাব্য, পদ্মানদীর মাঝি, পুতুলনাচের ইতিকথা, শহরতলী, চিহ্ন, চতুষ্কোণ , সার্বজনীন, আরোগ্য ইত্যাদি। পদ্মা নদীর মাঝি নিয়ে গৌতম ঘোষ নির্মাণ করেন কালজয়ী এক চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রের প্রধান দুই চরিত্র কুবের মাঝি ও কপিলা কে নিয়ে বাংলাদেশের জনপ্রিয় নাট্য নির্মাতা শিমুল সরকার নির্মাণ করছেন ভিন্ন ধারার একটি ওয়েব সিরিজ “কপিলা মাঝি”। হাস্যরসের মাধ্যমে সমসাময়িক বিষয়বস্তু নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক এই সিরিজটি মেসেজ নির্ভর। এ ব্যাপারে শিমুল সরকার জানান – মাঝি এবং কপিলা চরিত্র দুটি এই প্রজন্মের কাছে বেশ জনপ্রিয়। তবে সেই জনপ্রিয়তা মূলত ফেসবুক মিম হিসেবে। যেহেতু এই প্রজন্ম এই চরিত্র দুটিকে চিনে এবং ভালিবাসে, সেহেতু এই চরিত্রের মাধ্যমে সামাজিক ম্যাসেজ টা খুবই কার্যকর হবে বলে আমার বিশ্বাস থেকেই দুটি চরিত্রের ছায়া অবলম্বনে এই নির্মাণ পরিকল্পনা।

 মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এর বিখ্যাত ছোটগল্প অতসী মামী, প্রাগৈতিহাসিক , সরীসৃপ , সমুদ্রের স্বাদ , হলুদ পোড়া , আজ কাল পরশুর গল্প, ফেরিওয়ালা ইত্যাদি।পদ্মানদীর মাঝি ও পুতুলনাচের ইতিকথা  উপন্যাস দুটি তাঁর বিখ্যাত রচনা। এ দুটির মাধ্যমেই তিনি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।

শেষ জীবনে তিনি  চরম অর্থ কষ্টে ভুগেছেন।  কিন্তু তবুও সাহিত্যকেই তিনি তাঁর পেশা হিসেবে আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন। ১৯৫৬ সালের ৩ ডিসেম্বর মাত্র আটচল্লিশ বছর বয়সে বিংশ শতাব্দীর বাঙলা ভাষার অন্যতম শক্তিশালী এ কথাসাহিত্যিক না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।

তাই আজ এই বিশেষ দিনে বিনোদন প্রতিদিন পরিবার তাকে স্মরণ করছে গভীর শ্রদ্ধার সাথে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here