বড় তারকার সিডিউল নিতে পারলেই সে ডিরেক্টর – মাসুদ সেজান

সাম্প্রতিক বাংলা নাটকের পতিত দশা নিয়ে ডয়েচে_ভেলে কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সময়ের জনপ্রিয় নাট্য নির্মাতা এই ইন্ডাস্ট্রির সামগ্রিক সমস্যা ও তার সমাধানের উপায় নিয়ে দীর্ঘ সময় নিয়ে কথা বলেছেন। বিনোদন প্রতিদিন এর পাঠক ও দর্শকদের জন্য তা হুবহু তুলে ধরা হলো –

আমি একজন নাট্যকার একজন পরিচালক এই পরিচয়টা একটা সময় আমার জন্য গর্বের ছিল, আনন্দের ছিল । কিন্তু ক্রমেই আমরা পরিস্থিতিকে সময়টাকে এমন একটা যায়গায় নিয়ে এসেছি-  এখন আমার এই পরিচয় দিতে কুণ্ঠাবোধ হয় ।  আমি লজ্জা পাই ।  আমার অস্বস্তি বোধ হয় ।  কেন এমনটি হলো? এর অনেকগুলো কারণ আছে। কারণ গুলো সম্পর্কে  আমরা কমবেশি সবাই জানি। বিস্তারিত ব্যাখ্যা করতে অনেক সময় প্রয়োজন । আমি সংক্ষেপে শুধু এটুকু বলি এর প্রধান কারণ তারা শিল্পের কাজ করতে এসে শিল্পের ধারে কাছেও নেই। আমরা  শিল্প থেকে অনেক দূরে সরে গেছি  । একজন শিল্পীর যে সামাজিক দায়বদ্ধতাচ,  যে নীতি-নৈতিকতা ,যে নান্দনিকতা থাকা আবশ্যক ,  অত্যাবশ্যক, সেগুলো থেকে আমরা  অনেক দূরে সরে যাচ্ছি । দূরে সরে গেছি ।

নাটকে আমরা কি বলছি ? কেন বলছি  ? কি বলবো ? কেন বলব ? কেন বলব না ? ইমপ্যাক্ট  কি ? এই বিষয়গুলো আমাদের মাথায় কাজ করছে না । একটা শ্রেণি আছে যারা বিশেষ করে টেলিভিশন যারা চালাচ্ছে তারা । মানে এই  ধরেন কজন তারকার নাম বলে দিচ্ছে যে অমুক অমুক তারকার সিডিউল নিয়ে আসো । সিডিউল নিতে পারলেই সে ডিরেক্টর হয়ে যাচ্ছে । মানে এইটা অদ্ভুত সময় এসেছে যে তারকার সিডিউল দিতে পারলে সে ডিরেকশন দেওয়ার যোগ্যতা রাখে । এই যদি হয় অবস্থা – একজন ডিরেক্টর হিসেবে একজন তারকার  সিডিউল নেওয়ার জন্য আক্ষরিক অর্থেই তার পা ধরে বসে থাকছে গিয়ে এবং তার সিডিউলটা নিতে পারলেই তার নামের সাথে ডিরেক্টর খেতাবটি যুক্ত হচ্ছে। এটিতেই সে খুশি । সে পকেট থেকে টাকা দিয়ে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে এই কাজটি করছে । এইটা খুব লজ্জার ব্যাপার ।

ডিরেক্টর হিসেবে এটাকে আমি কী বলবো? ব্যাখার কিছু নাই আসলে । কীভাবে ব্যাখা করবো ? এই যদি হয় অবস্থা শিল্পের । আর যে শিল্পীরা কিংবা শিল্পী আমি বলতে চাই না, যে তারকা,যাদের আমরা বলছি তাদের নীতি নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন আছে । আমরা এমন এক সময়ে আছি যে আমরা শিল্পের কাজ করছি, নাটক একটা শিল্পমাধ্যম জানি কিন্তু আমরা এতো মোহগ্রস্ত হয়ে গেলাম !! আমরা টাকার পেছনে এতোটা ছুটলাম যে কে কত টাকা দিচ্ছে বেশি আমরা তাকেই শিডিউল দিচ্ছি । কি একটা অদ্ভুত ব্যাপার। 

স্ক্রিপ্ট কী? গল্প কী? গল্পে মানে মেসেজটা কী? সেটা আমরা দেখছিনা । কে বেশি টাকা দিচ্ছে এবং কাকে আমি ডমিনেট করতে পারছি তাকে আমি শিডিউল দিচ্ছি । একজন তারকা আমাকে শিডিউল দিতে স্বস্তি বোধ করছে না কারণ এখানে এসে আমাকে ডমিনেট করতে পারবে না ।সে যে ডিরেক্টরকে ডমিনেট করতে পারছে তাকেই সিডিউল দিচ্ছে এবং সেখানে আমি এইরকম শুনেছি যে সেটে গিয়ে স্ক্রিপ্ট ফেলে দিয়ে । একদম তাদের মতো করে এবং অদ্ভুত ব্যাপার যে এখানে কিছু জুটি প্রথা তৈরি হয়েছে । মানে জুটি প্রথা আগেও ছিলো । কিন্তু এইরকম ন্যক্কারজনক অবস্থায় ছিলো না ।

নায়কের সিডিউল নিলে নায়িকা পাওয়া যায়,নায়িকার সিডিউল মিলে নায়ক পাওয়া যায় এই যে একটা অদ্ভুত ক্যারিক্যাচার । মানে এইটাকে কি বলবো ? তারা নিজেরা সেটে গিয়ে স্ক্রিপ্ট নিজেদের মত করে সাজিয়ে নিচ্ছে , সাজিয়ে নিয়ে ডায়লগ তাদের মতো করে নাকি দিচ্ছে। কি অদ্ভুত ! তাদের মতো করে ডায়লগ দিচ্ছে তাদের মতো করে সাজাচ্ছে এবং ডিরেক্টর শুধু মনিটরে বসে একশন কার্ট ,১ ২ ৩ ৪ ৫ গুণে। কি অদ্ভুত ব্যাপার । কিছু ডিওপি মানে যারা ক্যামেরা চালায় ,ক্যামেরাম্যান বলতাম, এরকম কিছু ভালো ডিওপি আছে । ঐ পরিচালক নাকি তাদেরকে গিয়ে ধরে । তার কারণ সেই পরিচালক নাটকের কাটিং পয়েন্ট বোঝেনা । ঐ ডিওপি সবকিছু করে দিচ্ছে, করে তাকে ডিরেক্টর বানিয়ে দিচ্ছে । এখন একজন আর্টিস্ট , একজন ডিরেক্টর বানায় ।একজন ক্যামেরাম্যান ডিরেক্টর বানায় । তার মানে এইটা কি হবে? উল্টা হয়ে গেছে আসলে । একজন ডিরেক্টর একটি কাজের কিংবা একজন নাট্যকার, একজন ডিরেক্টর একটি স্ক্রিপ্ট,একটি কাজের সুন্দর করে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করবে । সেই ঘটনাটি ঘটছে উল্টাভাবে। এখন এইটার কোনো সমাধান কী আছে? কাদেরকে কে বলবে? কী বলবে?কীভাবে বলবে?

এখন আমরা বছরে একটা দুইটা যখন এই রকম ইস্যু আমাদের সামনে আসছে তখনই হায় হায় এইটা কী বললো নাটকে ? নাটকের মধ্যে এইটা কেন বলবে? তখন হয়তো ব্যাপার গুলো আলোচনায় আসছে। তখন হয়তো বিষয়গুলো নিয়ে আমরা কথা বলছি। কিন্তু এইটাই এখন ট্রেন্ড। টুট টুট ট্রেন্ড। মানে নাটকের মধ্যে টুট টুট না দিলে নাকি ভিউ পায় না । তো এটাই হচ্ছে, মানে এইটা শিল্পের মধ্যেই নাই ব্যাপারটা । আমরা শিল্প বলতে যেই চেতনাকে বুঝি । আমরা শিল্প বলতে যেই নান্দনিকতাকে বুঝি । তার ধারে কাছেও নাই । কোনো লেখাপড়া নাই,কোনো দেখা শোনা নাই, কোনো বোঝাপড়া নাই,  আমরা টাকার জন্য কাজ করছি এবং কিছু এজেন্সী, কিছু চ্যানেল এইরকম চাটুকার এরকম ব্যাকবোনলেস ডিরেক্টরদেরকেই তারা খুঁজে, তারা চায় যারা ওখানে ধরনা দিতে পারে ধরনা দেয়, তাদেরকেই তারা কাজ দিচ্ছে । তাদেরকে কাজ দিচ্ছে এবং তারা কাজ করছে । চ্যানেল ভর্তি তাদের কাজ । যে কারণে এখন আমার চ্যানেলে কাজ করতে ইচ্ছা করছে না । কী বলবো? খুব দুঃখ পাচ্ছি, কষ্ট পাচ্ছি কিন্তু কিছু বলার নাই । ফাইটটা তো একা দেওয়া যাবে না । একা দেওয়ার না আসলে । আমি ওপেন ঘোষণা করেছি । ঘোষণা দিয়েছি । যে আমি নিজে এই কাজ করবো না । এইরকম তো আরো দশজনকে বলতে হবে । দশজন শিল্পী, দশজন ডিরেক্টর, দশজন নাট্যকার যদি একজোট হয়ে একটি ভালোর জন্য কিংবা প্রকৃত শিল্পের জন্য যদি কাজ করতে পরাতাম, কিংবা করতে পারতো । তাহলে হয়তো অবস্থা একটু বদলাতো।

আরেকটা  হলো এখন টেলিভিশন চ্যানেলের ব্যর্থতার কারনে দেখেন কি অদ্ভুত ব্যাপার যে ইউটিউব চ্যানেলগুলো কিংবা এরকম নানা যেই অনলাইন ভিত্তিক যেটা হয়েছে এখন তারা চ্যানেলের কাছ থেকে তাদের একটা স্বত্ত্ব কিনতো । শুরুর দিকে বলছি । যে আপনার চ্যানেলের নাটকের ইউটিউব স্বত্ত্বটা দেন কিংবা অনলাইন স্বত্ত্বটা দেন । এখন উল্টাটা হয়েছে । এখন চ্যানেল ঐ ইউটিউবের কাছ থেকে স্বত্ত্ব কিনছে । মানে একেবারেই বিপরীত । যে কারণে চ্যানেলের কাছে এখন কাস্টিংটাও নাই । আগে চ্যানেল কাস্টিং বলে দিতো । এখন ইউটিউবরা করছে, যে ইউটিউব চ্যানেল যারা চালাচ্ছে । কিংবা অনলাইন প্লাটফরম যারা চালাচ্ছে।

তারা কাস্টিং করছে, তারা সবকিছু করছে । ওখান থেকে শুধু টেলিভিশনে চালানোর জন্য টেলিভিশন স্বত্বটা টেলিভিশনকে দেয়া হচ্ছে । একেবারে বিপরীত এরকম একটা জগাখিচুড়ি অবস্থার মধ্যে শিল্পচর্চা কিভাবে সম্ভব এবং যারা এই কাজটা করছে তাদের নীতি নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন আছে । আমি কিছুদিন আগে একটি দৈনিকে ইন্টারভিউ দিয়েছিলাম সেখানে বলেছিলাম যে ভাই সব পেশাতেই তো রিটায়ারমেন্ট সিস্টেম আছে ।তা আপনাদের কিছু কিছু আর্টিস্টকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলাম যে আপনাদেরকে রিটায়ারমেন্টে যাওয়া উচিত । আপনাদের মধ্যে শিল্প আর নাই। ঐটা একটা সময় ধারণ করতেন । এখন আর নাই । এখন লোভ লালসা ,পার্টি, প্রোগ্রাম এইসব নানান রকমের ধান্দা ফিকিরের মধ্যে ঢুকে গেছেন । তো আপনারা বাদ দেন না এইসব । তখন এটা নিয়ে আমার প্রতি আমার উপরে নানান ঝড় ঝাপটা এসেছে, চ্যানেলে চ্যানেলে বলা হয়েছে যে,আমার নাটক যেন না কেনা হয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমার নামে মানে নানান রকমের যত প্রকারের মানে ফালতু প্রোপাগান্ডা করা যায় সবই তারা করেছে।

আমার যায় আসেনা তাতে । আমি কাউকে কেয়ার করে মিডিয়াতে কাজ করতে আসিনি । আমি সেটা করিও না । কথা হচ্ছে যে আমরা যদি শিল্পচর্চা করতে চাই, আমরা জানি যে নাটক,নাটকের শুরুটা আমরা জানি এবং এই নাটকের এখন যেটা আমরা বিভিন্ন অনলাইন প্লাটফরম গুলো আসাতে আমরা বিভিন্ন নাম দিয়েছি। কিন্তু টিভি নাটকের তো এক ধরনের রূপান্তর । এইটার স্বর্ণালী একটা সময় ছিল । একটা যুগ ছিলো । আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখতাম

এখন দর্শক যা দেখছে। যাতে ভিউ হচ্ছে । সেটা দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ি সবাই মিলে । তাহলে দর্শকের তো দোষ নেই। আমরা, আমাদের কাজটা কি ?একজন শিল্পীর কাজ কিন্তু একই সঙ্গে শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতা মানে কি ? দর্শকের রুচি তৈরিতে ভূমিকা রাখবে । গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব সেটা। গণমাধ্যম তো সেই জায়গাতে নেয় । এখন শিল্পী যদি যায়গা থেকে সরে যায়, তাহলে এই দেশ,জাতি, কৃষ্টি-কালচারের কি হবে আমি জানিনা। আমাদের উচিৎ যে কাজটি করছি সেই কাজটি সততার সঙ্গে করা। সেই কাজটি নীতি-নৈতিকতার সঙ্গে করা । সেই কাজটিই মন দিয়ে করা । প্রেম দিয়ে করা । ভালোবাসা দিয়ে করা ।শুধু টাকা ইনকামের ক্ষেত্র শিল্পচর্চা নয় । শুধু টাকা ইনকামের ক্ষেত্র অনেক আছে , শিল্পচর্চা নয়। যদি শুধুমাত্র টাকা ইনকামের ধান্দা হয়ে থাকে তাহলে বাদ দেন ভাই, এসব বাদ দেন । আর এখানে দর্শকেও বলি যে, দর্শক যেটা চাচ্ছে, দর্শক যেটা চায়, এই করে তো আপনারা সিনেমাটাকেও নষ্ট করে দিয়েছেন । আপনারা একসময় বলা শুরু করলেন যে দর্শকরা এইরকম চায় । তারপর আপনারা কাটপিস ঢুকানো শুরু করলেন সিনেমাতে । তারপর সিনেমাহল শেষ। কাটপিস দিয়ে কিছুদিন সিনেমাহল টিকিয়ে রাখতে পেরেছিলেন। কিছুদিন । এখন আপনারা যে টুট টুট দিচ্ছেন সেই টুট টুট দিয়ে কিছুদিন হয়তো টিকিয়ে রাখা সম্ভব আপনার ভিউ, আপনার ফলোয়ারকে । কিন্তু বেশিদিন টিকিয়ে রাখা সম্ভব না । কারণ আলটিমেটলি শিল্পটাকে শিল্পের জায়গায় থাকতে হবে।রাখতে হবে । এর কোনো বিকল্প নেই।

(কৃতজ্ঞতা ডয়েচে_ভেলে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here