বাংলাদেশী ৫ সিনেমা পেলো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

বাংলাদেশী ৫ সিনেমা পেলো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

গত দেড় দশকে দেশীয় চলচ্চিত্রে বাঁকবদল ছিল চোখে পড়ার মতো। নির্মাণশৈলী থেকে শুরু করে ছবির গল্প উপস্থাপনেও ছিল ভিন্নতা। যদিও অনেকে ছবি সমালোচনার মুখে পড়েছে, তারপরও চলচ্চিত্র নির্মাণের নিরীক্ষা থেমে থাকেনি। যার পরিপ্রেক্ষিতে স্বদেশের পাশাপাশি সে ছবিগুলো বিভিন্ন দেশের দর্শকেরও মনোযোগ কাড়তে সক্ষম হয়েছে। পাশাপাশি একাধিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনের মাধ্যমে পেয়েছে সেরা ছবির স্বীকৃতি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দর্শক প্রশংসা ও স্বীকৃতি পাওয়া অনেক ছবির মধ্যে বিভিন্ন শাখাতে সেরা ৫টা ছবি নিয়ে এই আয়োজন।  

বিভিন্ন সময়ে দেশি সিনেমা নিয়ে নানা রকম অনুভূতির প্রকাশ দেখতে পাই দর্শকের মাঝে।  দর্শকের মুখে শুনেছি, ‘অশ্নীলতা আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প গ্রাস করছে’, ‘নকলের দ্বৈরথ থেমে নেই’, ‘সস্তা গল্পের মানহীন ছবি নির্মাণ চলছেই’ ‘দেশীয় চলচ্চিত্র গোল্লায় গেল’, – এমন অনেক নেতিবাচক মন্তব্য। একইভাবে আমরা শুনেছি, ‘নতুনরা সম্ভাবনার আলো দেখাচ্ছে’, ‘স্বল্প বাজেটেও ভালো ছবি সম্ভব, এটা এখনকার নির্মাতারা দেখিয়ে দিয়েছেন’, ‘আমাদের চলচ্চিত্র নিয়েও এখন গর্ব করা যায়’ ‘চলচ্চিত্রের বাঁকবদল হচ্ছে’, – এমন অনেক আশাব্যঞ্জক কথা। একদিকে অর্থলগ্নি করে লাভবান হওয়ার ভাবনায় চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন কেউ কেউ, অন্যদিকে আরেক দল চাইছে সিনেমায় শিল্পের ছোঁয়া তুলে ধরতে। একইভাবে চলচ্চিত্রের নিরীক্ষাও থেমে নেই। তাই দেশি চলচ্চিত্র নিয়ে আমরা একদিকে যেমন হতাশার কথা তুলে ধরছি, অন্যদিকে গর্ব করার মতো কাজও দেখতে পাচ্ছি বড় পর্দায়। যদিও মুক্তি পাওয়া ছবির বিচারে দেশ-বিদেশে দর্শক প্রশংসা ও স্বীকৃতি পাওয়া ছবির সংখ্যা তুলনামূলক কম, তারপরও আমাদের ছবি যে অন্যান্য দেশ থেকে পিছিয়ে নেই, সেটাও আলোচনার মতো একটি বিষয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে দর্শক প্রশংসা কুড়ানোর পাশাপাশি স্বীকৃতি পাওয়া কিছু ছবি নিয়ে আমাদের এবারের আলোচনা।


‘মাটির ময়না’ ছবির সেটে পরিচালক তারেক মাসুদ

যার শুরুতেই আসে তারেক মাসুদ পরিচালিত ‘মাটির ময়না’ ছবির কথা। ২০০২ সালে ৫৫তম কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্যারালাল বিভাগ ‘ডিরেক্টরস ফোর্টনাইট’-এ মনোনয়ন পেয়ে ‘ফিপরেস্কি’ সমালোচক পুরস্কারও জিতেছিল ‘মাটির ময়না’ ছবিটি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে গণঅভ্যুত্থানের পটভূমি নিয়ে নির্মিত এ ছবিটি স্বীকৃতির পাশাপাশি চলচ্চিত্রবোদ্ধাদেরও প্রশংসা কুড়িয়েছে। এরপর বিভিন্ন দেশে আয়োজিত একাধিক চলচ্চিত্র উৎসবে এ ছবির পাশাপাশি দেশি আরও বেশ কিছু ছবি প্রদর্শিত হয়েছে।


‘অজ্ঞাতনামা’ ছবির একটি দৃশ্যতে ফজলুর রহমান বাবু  

স্বীকৃতির পাশাপাশি দর্শক-সমালোচক প্রশংসাও কুড়িয়েছে একাধিক ছবি। সে তালিকা একেবারে ছোট নয়। সে তালিকায় যেসব ছবির নাম উঠে আসে, তার মধ্য অন্যতম তৌকীর আহমেদের ‘অজ্ঞাতমানা’ ছবিটি। কসোভোর চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা পরিচালক ও সেরা চিত্রনাট্যের পুরস্কার ওঠে ‘অজ্ঞাতনামা’র ঘরে। এমনকি অস্কারে বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে বাংলাদেশ থেকে মনোনীত হয় ‘অজ্ঞাতনামা’। এ নিয়ে তৌকীর আহমেদ বলেন, ‘স্বীকৃতির আর দর্শকের ভালো লাগায় নির্মাতারা নতুন কাজের প্রেরণা পান। আমার বেলায় তার ব্যতিক্রম হয়নি। অজ্ঞাতনামার সাফল্যই আমাকে পরবর্তী কাজ নিয়ে নতুন করে ভাবিয়েছে।’

তৌকীর আহমেদের মতো একই কথা শোনা গেছে আরেক নন্দিত নির্মাতা অমিতাভ রেজা চৌধুরীর মুখে। ‘আয়নাবাজি’ ছবির সাফল্য ব্যতিক্রমী ছবি নির্মাণে প্রেরণা জুগিয়েছে বলেও জানান তিনি। ‘আয়নাবাজি’ ছবিটি দেশের দর্শক মাতিয়ে বিদেশেও আলোড়ন তুলেছিল। ৬৯তম কান চলচ্চিত্র উৎসবে দো ফিল্ম বাণিজ্যিক বিভাগে প্রদর্শিত হয়েছিল ছবিটি। পরে কানাডা, প্যারিস, লন্ডন, ভারতেও ছবিটি প্রদর্শিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটল সাউথ এশিয়ান চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কারও পেয়েছে ‘আয়নাবাজি।’ এ ছবির অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী বলেন, “‘আয়নাবাজি’ দেশে এবং দেশের বাইরে দর্শকের কাছে যেভাবে সাড়া ফেলেছে, তা আমার শিল্পীজীবনের স্মরণীয় একটি অধ্যায় হয়ে থাকবে। দর্শকের এই ভালোবাসাই শিল্পীজীবনের বড় স্বীকৃতি বলে মনে করি।”


‘জালালের গল্প’ ছবির একটি দৃশ্যে মোশাররফ করিম ও মৌসুমি হামিদ

চঞ্চল চৌধুরীর মতো অভিনেতা মোশাররফ করিমের একাধিক ছবি বিভিন্ন দেশে প্রদর্শিত হয়েছে। স্বীকৃতির পাশাপাশি পেয়েছেন চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের প্রশংসা। মোশাররফ করিম অভিনীত ‘জালালের গল্প’ ছবিটি ২০১৫ সালে পর্তুগালে অনুষ্ঠিত ১৯তম ‘আভাস্কা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’-এ সেরা ছবি নির্বাচিত হয়েছিল। শুধু তাই নয়, এই ছবির জন্য সেরা অভিনেতার পুরস্কারও পেয়েছেন মোশাররফ করিম। এ নিয়ে তিনি বলেন, “একটি কাজ তখনই পরিপূর্ণতা পায়, যখন দর্শক ও সমালোচক তাকে সেরা কাজ বলে স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন। সে হিসেবে ‘জালালের গল্প’ আমার চলচ্চিত্র জীবনের অন্যতম কাজ হিসেবেই উল্লেখ করতে চাই।” ‘আভাস্কা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে স্বীকৃতি পাওয়ার এক বছর আগেই ‘জালালের গল্প’ ছবিটি ১৯তম বুসান চলচ্চিত্র উৎসবের এশিয়ান সিনেমা ফান্ড পেয়েছিল। উৎসবটির মূল প্রতিযোগিতা বিভাগ ‘নিউ কারেন্টস’ বিভাগে প্রথম বাংলাদেশি ছবি হিসেবে বিশ্ব প্রিমিয়ারও হয়েছিল। সেই সঙ্গে সুইডেনের গোটেবুর্গ চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা পিচিংয়ের জন্য পুরস্কার পায় ছবিটি।

মোশাররফ ও চঞ্চল চৌধুরী অভিনীত ‘টেলিভিশন’ ছবিটি মুক্তির পর থেকেই আলোচনায় ছিল। নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘নো ল্যান্ডস ম্যান’ ছবিটি ২৬তম বুসান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘কিম জিসুক পুরস্কার’-এর জন্য মনোনীত হয়েছে। মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর এই ছবির প্রযোজক, অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশা বলেন, “শুধু আমি নই, যারা ‘নো ল্যান্ডস ম্যান’ ছবির সঙ্গে নানাভাবে জড়িয়ে আছি, সবার জন্যই এটা আনন্দের খবর। আমার জন্য বাড়তি ভালো লাগা এটাই যে, নিজের প্রথম প্রযোজিত ছবি ‘কিম জিসুক অ্যাওয়ার্ড’-এর জন্য মনোনয়ন পেয়েছে। কোনো উৎসবে প্রযোজক কিংবা অভিনেত্রী যে পরিচয়ে যাই না কেন, নিজেদের কাজটি দর্শকের মনে কী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করল- সেটা জানার আগ্রহই বেশি থাকে। আসলে ভালো কিছু করার জন্য আমরা যখন নিবেদিত থাকি, তখন এই প্রত্যাশা থাকে, পরিকল্পনামাফিক যেন কাজটি শেষ হয়। আর সেটা করতে পারলেই নানা শ্রেণির দর্শক মতামত জানার আগ্রহ জাগে। সে জন্যই বিভিন্ন উৎসবে ছবি প্রদর্শনের এই চেষ্টা।”

একই রকম মন্তব্য শোনা গেছে চলতি বছর অনুষ্ঠিত ৭৪তম কান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ ছবির অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের মুখে। উৎসবে নির্মাতা আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের এই ছবিটি ছবির অফিসিয়াল বিভাগ ‘আঁ সার্তেই রিগাদ’-এ স্থান পেয়েছিল এবং প্রদর্শনের পর চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের প্রশংসাও কুড়িয়েছে। এ নিয়ে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন বলেন, “একদল তরুণের সীমানা পেরিয়ে যাওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা তার অন্য একটি নাম ‘রেহানা মরিয়ম নূর’। যে নিষ্ঠার সঙ্গে ছবির প্রতিটি মানুষ কাজ করে গেছেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে এটুকু প্রাপ্তি অপ্রত্যাশিত নয় বলেই আমি মনে করি।”

শুধু ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ নয়, নির্মাতা আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ তার ‘লাইভ ফ্রম ঢাকা’ ছবিটি নিয়েও আলোচনায় ছিলেন দীর্ঘ সময়। ছবিটি সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা নির্মাতা ও সেরা অভিনেতার পুরস্কার জয় করে নিয়েছে। অন্যদিকে বিজন ইমতিয়াজের ‘মাটির প্রজার দেশে’ শিকাগোতে অনুষ্ঠিত সাউথ এশিয়ান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা ছবি নির্বাচিত হয়েছিল। পাশাপাশি রুবাইয়াত হোসেন নির্মিত ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’ ছবিটি ফ্রান্সের ৩৪তম ত্যুস কুউস ইন্টারন্যাশনাল শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ইন্টারন্যাশনাল কম্পিটিশন বিভাগে ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হওয়ার নতুন আলোচনায় আসে।

এর বাইরেও নির্মাতা ফাখরুল আরেফীন খানের ‘ভুবন মাঝি’, তাসমিয়াহ্ আফরিন মৌয়ের ‘কবি স্বামীর মৃত্যুর পর আমার জবানবন্দি’, কামার আহমাদ সাইমনের ‘শিকলবাহা’সহ আরও বেশ কয়েকজন নির্মাতার বেশ কিছু ছবি বিভিন্ন উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে। প্রদর্শনী শেষে দেশীয় চলচ্চিত্রের জন্য বয়ে এনেছে সম্মাননা।

যতটা হতাশার কথা দর্শকের মুখে শোনা যায়, ততটা হতাশাজনক কাজ হচ্ছে- এটা ভাবার কোনো কারণ নেই বলেই অভিমত অনেকের। বরং সংখ্যায় কম হলেও দেশীয় চলচ্চিত্রের তালিকায় এমন কিছু ছবির নাম যুক্ত হয়েছে, যা নিয়ে আমরা গর্ব করতে পারি বলেই মনে করেন অনেক দর্শক ও চলচ্চিত্র সমালোচক। তাই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের মধ্য দিয়ে আমাদের চলচ্চিত্র আরও সমৃদ্ধ হবে বলেই আশা করা যায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here