বাংলা সাহিত্যে তিনিই প্রথম এপিক উপন্যাস লিখেছেন-অন্নদাশঙ্কর রায় (ভিডিও)

বাংলা সাহিত্যে তিনিই প্রথম এপিক উপন্যাস লিখেছেন-অন্নদাশঙ্কর রায় (ভিডিও)

যারা ধার্মিক তারা চিরন্তনকে বলে ধর্ম। যারা প্রেমিক তাঁরা বলে প্রেম। যারা শিল্পী তারা বলে রস। আমরা শিল্পী। আমরা রসকে চিরন্তন বলে জানি।

হ্যাঁ ওপরের কথাগুলো লিখেছিলেন অন্নদাশঙ্কর রায়, যাকে নিশ শতকের বাঙালি রেনেসাঁ ঐতিহ্যের শেষ বুদ্ধিজীবী হিসেবে অভিহিত করা হয় ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, কবি, চিন্তাবিদ। ওড়িশার দেশীয় রাজ্য ঢেঙ্কানালের এক শাক্ত পরিবারে অন্নদাশঙ্কর রায়ের জন্ম। তাঁর পিতা নিমাইচরণ রায় ও মা হেমনলিনী। তাঁর পূর্বপুরুষের আদি নিবাস ছিল পশ্চিম বঙ্গের হুগলি জেলার কোতরং গ্রামে। কর্মসূত্রে তাঁরা ওড়িশার ঢেঙ্কানালে বসবাস শুরু করেন। জমিদার হিসেবে অন্নদাশঙ্করের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন প্রজাহিতৈষী, মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাসী। অন্নদাশঙ্কর রায় ২৮ অক্টোবর ২০০২ মৃত্যুবরণ করেন।

বাংলার নবজাগরণের শেষ প্রতিনিধি অন্নদাশঙ্কর রায়ের মনের গহীনে বাংলাদেশ ছিল বিরাট জায়গা জুড়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে শাহাদাত বরণের পর গোটা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এবং সংস্কৃতি দুনিয়া যখন আশ্চর্য নীরবতা পালন করছে তখন অন্নদাশঙ্করের উদ্যোগেই এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের প্রথম প্রতিবাদ উচ্চারিত হয়েছিল কলকাতাতে।

অন্নদাশঙ্করের প্রতিজ্ঞা ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার না হলে তিনি আর বাংলাদেশে যাবেন না। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর যখন ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল হয় তখন বাংলাদেশের স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী উপলক্ষে অন্নদাশঙ্করকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে অনুরোধ জানান সুফিয়া কামাল, শামসুর রাহমান, কবীর চৌধুরী। সানন্দে সেই আবেদনে সম্মতি দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা।

১৯৯৬ এর ১৪ ডিসেম্বর সকালে বাংলাদেশ বিমানে ঢাকার উদ্দেশে বসেই বিমানের আসনে রাখা বাংলাদেশের খবরের কাগজগুলি তুলে নেন অন্নদাশঙ্কর। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের ছবি দেখে মুনীর চৌধুরী আর মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর স্মৃতিতে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন অন্নদাশঙ্কর।

বঙ্গবন্ধু হত্যা, জেল হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার- কখনো নিশ্চুপ দর্শক অন্নদাশঙ্কর ছিলেন না। দেশভাগ উত্তরকালে পশ্চিমবঙ্গের গণমাধ্যম যখন সুফিয়া কামালের মতো মানুষকে ভুলে থাকতে চেয়েছে, অন্নদাশঙ্করই এপার বাংলার একমাত্র বুদ্ধিজীবী, যিনি ‘সুফিয়া বোন আমার’ শিরোনামে কলম ধরেছেন। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম সম্পর্কে কলকাতার মিডিয়া নিশ্চুপ, সেই নীরবতাকে ভাঙতে বাধ্য করেছিলেন অন্নদাশঙ্কর নিজের লেখা দিয়ে। ১৯৫৩ সালে শান্তিনিকেতনে সাহিত্য মেলা করে এপার বাংলার সাহিত্য জগতের কাছে শামসুর রাহমানকে প্রথম পরিচিত করেন অন্নদাশঙ্কর। তিনি যেভাবে অখণ্ড বাঙালি জাতিসত্তায় বিশ্বাসী ছিলেন, তেমন আন্তরিক বিশ্বাস এপার বাংলার বুদ্ধিজীবীদের ভেতরে তিনি ছাড়া বিশেষ কাউকে দেখা যায়নি।

১৯৭৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে জগত্তারিণী পদক পুরস্কারে ভূষিত করে। তাকে দেশিকোত্তম সম্মান প্রদান করে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডক্টর অব লিটারেচার (ডিলিট) উপাধি প্রদান করে। অন্নদাশঙ্কর রায় প্রাপ্ত অন্যান্য পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার (১৯৬২), আনন্দ পুরস্কার (দুইবার-১৯৮৩, ১৯৯৪), বিদ্যাসাগর পুরস্কার, শিরোমণি পুরস্কার (১৯৯৫), রবীন্দ্র পুরস্কার, নজরুল পুরস্কার, বাংলাদেশের জেবুন্নিসা পুরস্কার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here