ভারতবর্ষের প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাতা হীরালাল সেন (ভিডিও)

ভারতবর্ষের প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাতা হীরালাল সেন (ভিডিও)

মানিকগঞ্জের কৃতী পুরুষ হীরালাল সেন উপমহাদেশের চলিচ্চিত্রের ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায়। আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না পেলেও ভারতবর্ষের প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে সর্বজন গৃহীত। বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া এই মানুষটিকে বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের জনক বলা। আজ ২৬ অক্টোবর হীরালাল সেনের প্রয়াণ দিবস। ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে ১৯১৭ সালের এইদিনে মাত্র ৫১ বছর বয়সে উপমহাদেশের চলচ্চিত্রের এই পথিকৃৎ প্রয়াত হন।  

চলচ্চিত্র নিয়ে হীরালাল সেনের চিন্তা ছিল সে-যুগের একটি নতুন উদ্ভাবনী ও উচ্চতর শৌখিন আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। তার কল্যাণে উপমহাদেশের চলচ্চিত্রের সম্ভাবনা নতুন দিগন্তের রূপ পায়। ১৮৯৬ সালে কলকাতায় আই এস সি ক্লাসে অধ্যয়নকালে স্টার থিয়েটার আয়োজিত চলচ্চিত্র প্রদর্শনী দেখে চলচ্চিত্রের প্রতি তার আগ্রহ সৃষ্টি হয়। ১৮৯৮ সালে কলকাতার ক্লাসিক থিয়েটারে চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর মাধ্যমে সিনেমা জগতে প্রবেশ করেন হীরালাল।

পরবর্তী সময়ে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, নাটক, বিজ্ঞাপন চিত্র প্রভৃতি তৈরির মধ্য দিয়ে বাঙালি হিসেবে বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হন। ভারত তথা উপমহাদেশের প্রথম বিজ্ঞাপনবিষয়ক চলচ্চিত্রের নির্মাতা তিনি। ১৯০৫ সালে ২২ সেপ্টেম্বর তিনিই নির্মাণ করেছিলেন বঙ্গভঙ্গ বিরোধী প্রথম রাজনৈতিক সিনেমা। ১৯১৭ সালে এক অগ্নিকাণ্ডে তার নির্মিত সব চলচ্চিত্র নষ্ট হয়ে যায়।

১৮৬৮ সালের ২ আগস্ট  ঢাকার অদূরে মানিকগঞ্জের বনজুরি গ্রামে তার জন্ম। হিরালাল সেন মানিকগঞ্জের বগজুরী গ্রামে ১৮৬৬ সালে আগস্ট মাসে সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।  তার পিতার নাম চন্দ্রমোহন সেন এবং মাতা ছিলেন বিধুমুখী। হীরালালের পিতামহ দাদা গোলককৃষ্ণ সেন ছিলেন মানিকগঞ্জের বিখ্যাত জমিদার ও ঢাকার ডাকসাইটে উকিল। চন্দ্রমোহনের চার পুত্র ও চার মেয়ের মধ্যে হীরালাল সেন ছিলেন দ্বিতীয়। তার শিক্ষা জীবন শুরু হয় মানিকগঞ্জ মাইনর স্কুলে। একই সাথে মৌলভী সাহেবের কাছে ফারসী ভাষাও শিখতেন। ১৮৭৯ সালে মাইনর পরীক্ষা পাস করে ঢাকার কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। পরে পিতার সাথে হীরালাল কোলকাতা গিয়ে কলেজে ভর্তি হন। আই.এস.সি. অধ্যয়নকালে চলচ্চিত্রের প্রতি ভীষণভাবে আকৃষ্ট হয়ে পরেন এবং প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার যবনিকাপাত ঘটে। গত শতাব্দির শুরুর দিকে হীরালাল সেন হেমাঙ্গিনী দেবীর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

স্কুলের ছাত্রাবস্থা থেকে হীরালাল সেনের ফটোগ্রাফীর প্রতি ছিল দারুণ আগ্রহ। ১৮৯৮ সালের ৪ এপ্রিল তিনি গঠন করেন রয়াল বায়স্কোপ কোম্পানি এবং কলকাতার ক্লাসিক থিয়েটারে প্রদর্শনী করেন। ১৮৯৮ সালে হীরালাল সেনের তোলা স্থিরচিত্র ভারতীয় শিল্প ও কৃষি প্রদর্শনীতে স্বর্ণপদক পায়। ১৮৯০ সালে প্রথমদিকে মানিকগঞ্জের নিজ বাড়িতে তিনি এইচএল সেন এন্ড ব্রাদার্স নামে একটি ফটোগ্রাফিক স্টুডিও খোলেন। এক পর্যায়ে বিদেশী সিনেমার মেশিন এনে হীরালাল সেন দি রয়েল বায়স্কোপ কোম্পানি গঠন করেন। ১৯০১ সালে হীরালাল সিনেমার কাজে হাত দেন। প্রথমে মুভি ক্যামেরা চালিয়ে আলো জ্বালিয়ে ছবি তোলার কাজ শুরু করেন।  তার চিত্রগ্রহণকৃত তিনটি নাটক হলো- বঙ্কিম চন্দ্রের ‘সীতারাম’, তারনাথের ‘সুবল’ ও ‘আলীবাবা’।

ইতিহাসের এক নিদারুণ ট্রাজেডির নায়ক হীরালাল। ১৯০০ সালে ‘পুকুরে স্নান’ ও ‘কোটের খেলা’ নামে দুটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এরই মধ্য দিয়ে শুরু হয় হীরালাল সেনের চলচ্চিত্র নির্মাণ, পরিকল্পনা ও প্রযোজনার অভিযাত্রা। চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রয়াসে তিনি ১৮৯৬ সালে যুক্ত হন এবং ১৯০০ সালের মধ্যেই ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম চলচ্চিত্রকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯০০ সাল থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত তিনি ৮০টি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এর মধ্যে রয়েছে কাহিনীচিত্র (নাটকের খ-দৃশ্য), তথ্যচিত্র, প্রামাণ্যচিত্র ও বিজ্ঞাপনচিত্র। এসব ছবির দৈর্ঘ্য ছিল ৫০ ফুট থেকে ২৫০ ফুট। ১৯০৪ সালে উপমহাদেশের প্রথম নির্বাক চলচ্চিত্র ‘আলীবাবা ও চল্লিশ চোর’ নির্মাণ করেন তিনি।  ১৯০৩ সালে তার রয়াল বায়স্কোপ কোম্পানি থেকে প্রথম বাংলায় সিকে সেনের মাথার তেল ‘জবাকুসুম’, বটফেস্ট পালের ‘এডওয়ার্ড টনিক’ ও ডব্লিউ মেজর কোম্পানির ‘সালসা পিলা’ প্রভৃতি বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মিত হয়। তাছাড়া তিনি প্রামাণ্যচিত্র ও সংবাদচিত্রও নির্মাণ করেন। দাদা সাহেব ফালকের নাম ভারতীয় সিনেমার অগ্রনায়ক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে ১৯১৩ সালে তার ‘রাজা হরিশ্চন্দ্র’ ছবিটি মুক্তি পাওয়ার সুবাদে।

সফল চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে হীরালাল সেন আজও অমর হয়ে আছেন। এই উপমহাদেশের চলচ্চিত্রে তার অসামান্য অবদানের কথা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here