ভারতীয় চলচ্চিত্রের উজ্জ্বল নক্ষত্র রাজেশ খান্না (ভিডিও)

ভারতীয় চলচ্চিত্রের উজ্জ্বল নক্ষত্র রাজেশ খান্না

রাজেশ খান্না ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম ব্যক্তিত্ব তথা উজ্জ্বল নক্ষত্র। অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্র নির্মাতা ও রাজনীতিবিদ ছিলেন। তাকে বলিউডের প্রথম সুপারস্টার নামে আখ্যায়িত করা হয়।  এছাড়াও, ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের প্রকৃত সুপারস্টার হিসেবেও পরিচিত ছিলেন তিনি। তিনি ১৯৬৯ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সময়কালে টানা ১৫টি ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রে মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেন, যা বলিউডের একটি রেকর্ড হিসেবে অদ্যাবধি বহাল তবিয়তে টিকে রয়েছে। বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক শক্তি সামন্তের আরাধনা চলচ্চিত্রে সহজাত অভিনয় করে তিনি বলিউড জগতে অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করেন। এছাড়াও, তার উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে – আনন্দ, কাটি পতঙ্গ, সফর, সাচা ঝুটা, রাজা রাণী, বাওয়ারর্চি, অমর প্রেম প্রমূখ।

১৯৪২ সালের ২৯ ডিসেম্বর আজকের দিনে রাজেশ খান্না জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে তার নাম ছিল যতীন অরোরা। চুন্নি লাল খান্না এবং লীলবতী খান্না তাকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেন ও বড় করে তোলেন। তারা রাজেশের প্রকৃত মা-বাবার আত্মীয়। রাজেশের পিতা-মাতা অবিভক্ত ভারতের অমৃতসরের গলি তিউয়ারিয়ান এলাকা থেকে অভিবাসিত হয়ে ১৯৪০ সালে ফিরে আসেন।

দত্তক গ্রহণের পর তার নতুন পরিচয় হয় যতীন খান্না। খান্না বোম্বের গিরগাঁও এলাকার ঠাকুরদোয়ারের কাছাকাছি সরস্বতী নিবাসে বাস করতেন। সেন্ট সেবাস্টিয়ান’স গোয়া হাইস্কুলে রবি কাপুর যিনি পরবর্তীকালে জীতেন্দ্র নামে অভিনয় জগতে প্রবেশ করেন, তার সাথে একত্রে পড়াশোনা করেন। ১৯৫৯ সালে মুম্বইয়ের পেদ্দার রোডে অবস্থিত হিল গ্র্যাঞ্জ হাইস্কুল থেকে স্নাতক ডিগ্রী সম্পন্ন করেন। খান্না থিয়েটারে তার আগ্রহ ব্যক্ত করেন এবং বিদ্যালয়ে অনেকগুলো মঞ্চ ও থিয়েটারে অভিনয় করেন। এরফলে কলেজ জীবনেই আন্তঃকলেজ নাটক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে অনেকগুলো পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৫৯ থেকে ১৯৬১ সালের মধ্যে পুনে এলাকায় অবস্থিত ওয়াদিয়া কলেজে বি.এ শ্রেণীতে অধ্যয়ন করেন। দু’বন্ধুই পরবর্তীকালে মুম্বইয়ের কিষিনচাঁদ চেলারাম কলেজে পড়াশোনা করেছিলেন। খান্না জীতেন্দ্রের প্রথম চলচ্চিত্র পরীক্ষায় অংশগ্রহণে শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। রাজেশ খান্না চলচ্চিত্রে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিলে তার কাকা নামের প্রথমাংশ পরিবর্তন করে রাজেশ রাখেন। তার বন্ধু এবং তার পত্নী তাকে কাকা নামে ডাকত।

অভিষেক চলচ্চিত্র ববি (১৯৭৩) মুক্তি পাবার ছয় মাস পূর্বে মার্চ, ১৯৭৩ তারিখে উঠতি বয়সী অভিনেত্রী ডিম্পল কাপাডিয়া রাজেশ খান্নাকে বিয়ে করেন। ১৯৮০-এর দশকে জনপ্রিয় অভিনেত্রী টিনা মুনিমের সাথে প্রেমে জড়িয়ে পড়েন রাজেশ। কিন্তু বিয়ের প্রস্তাব অগ্রাহ্য করলে টিনা মুনিম উচ্চতর শিক্ষাগ্রহণের জন্য চলচ্চিত্র জগৎ ত্যাগ করে ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে যান।

রাজেশ-ডিম্পলের জ্যেষ্ঠা কন্যা ইন্টারিয়র ডেকোরেটর ও সাবেক অভিনেত্রী টুইঙ্কল খান্না অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা অক্ষয় কুমারকে বিয়ে করেন।

অনীতা আদভানী নামীয় এক নারীর সাথে ২০০৪ সাল থেকে মৃত্যু-পূর্ব পর্যন্ত অবস্থান করেন রাজেশ।

তিনি ১৬৩টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। তন্মধ্যে ১২৮টি চলচ্চিত্রেই মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করতে দেখা যায়। এছাড়াও, ১৭টি স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। রাজেশ খান্না চৌদ্দবার মনোনয়নসহ তিনবার ফিল্মফেয়ার সেরা অভিনেতার পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়াও, চারবার বিএফজেএ সেরা অভিনেতার পুরস্কার পান ও ২৫ বার মনোনয়ন লাভ করেন। ১৯৯১ সালে চলচ্চিত্র জগতে ২৫ বছর পূর্তিতে ফিল্মফেয়ার বিশেষ পুরস্কার লাভ করেন। এ সময়ে তিনি ১০৬টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন। ফিল্মফেয়ার আজীবন সম্মাননা পুরস্কার লাভ করেন ২০০৫ সালে। ১৯৬৬ সালে আখরী খাত চলচ্চিত্রে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তার বিরোচিত অভিনয় জীবনের সূত্রপাত ঘটে। এরপর একে একে অভিনয় করেন রাজ (১৯৬৭), বাহারো কি স্বপ্নে, ইত্তেফাক, আনন্দ, আরাধনার ন্যায় চলচ্চিত্রসমূহে।

১৯৭০-৭৯ সময়কালের মধ্যে সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত অভিনেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। এছাড়াও, ১৯৮০-৮৭ সাল পর্যন্ত বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা অমিতাভ বচ্চনের সাথে যুগ্মভাবে সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত অভিনেতা ছিলেন।

১৯৯২ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত নয়াদিল্লী আসনে লোকসভায় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দলের পক্ষ থেকে প্রতিনিধিত্ব করেন রাজেশ খান্না। তিনি উপ-নির্বাচনে জয়লাভ করেছিলেন। সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় তিনি নতুন কোন চলচ্চিত্রে অংশগ্রহণে সম্মতিজ্ঞাপন করেননি। সংসদ থেকে চলে গেলেও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের পক্ষে ২০১২ সালের নির্বাচনের প্রচারণায় অংশগ্রহণ করেন।

খান্না এবং একদল বিদেশী বিনিয়োগকারীর যৌথ উদ্যোগে শিরডিতে জমি ক্রয় করেন। তারা সেখানে সাঁই বাবার ধর্মীয় কুটির নির্মাণের লক্ষ্যে পরিকল্পনা করেছিলেন।

১৯৬৯ সালে শক্তি সামন্তের পরিচালনায় বলিউডে আরাধনা চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয় ও মুক্তি পায়। এতে রাজেশ খান্নার বিপরীতে নায়িকার ভূমিকায় ছিলেন প্রখ্যাত ভারতীয় বাঙালি অভিনেত্রী শর্মিলা ঠাকুর। চলচ্চিত্রটি ১৯৪৬ সালে হলিউডে ‘টু ইচ হিস অউন’ শিরোনামে সর্বপ্রথম নির্মিত হয়েছিল যা পরবর্তীতে হিন্দিতে ‘আরাধনা’ নামে নতুন করে নির্মিত হয়। বছরের সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে এটি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার লাভ করে। শর্মিলা ঠাকুরও ফিল্মফেয়ার সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার লাভ করেন যা হলিউড চলচ্চিত্রে একই ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে অলিভিয়া দ্য হ্যাভিল্যান্ড তার সেরা অভিনেত্রী হিসেবে একাডেমি পুরস্কার লাভ করেছিলেন।

হিন্দিতে প্রথমে চলচ্চিত্রটি নির্মিত হলেও পরবর্তীতে বাংলা ভাষায়ও এটি ডাবিং করা হয়। আরাধনা চলচ্চিত্রের ব্যাপক ব্যবসায়িক সাফল্যে আরো দু’টি ভাষা – তামিল ও তেলুগু ভাষায় যথাক্রমে সিবকামিইন সেলভান (১৯৭৪) ও কন্যাবাড়ি কালাউ (১৯৭৪) নামে পুনরায় নির্মিত হয় যাতে শর্মিলা ঠাকুর বনশ্রী চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।

আজ ২৯ ডিসেম্বর । ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের নক্ষত্র, চলচ্চিত্র নির্মাতা,  রাজনীতিবিদ ও বলিউডের প্রথম সুপারস্টার রাজেশ খান্নার জন্মদিনে বিনোদন প্রতিদিন পরিবারের পক্ষ থেকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here