মায়ের চিকিৎসা নিয়ে বেদনার কথা শুনালেন আফজাল হোসেন

0
105

বরেণ্য অভিনেতা, নির্মাতা আফজাল হোসেন তার মায়ের চিকিৎসা এবং হাসপাতাল ব্যবসা নিয়ে ক্ষোভের কথা লিখেছেন তার ফেসবুক ওয়ালে। গুরুতর অবস্থাতেও মা কে হাসপাতালে নিতে কিভাবে কিছু পশুর মতো মানুষকে অতিক্রম করতে হয়েছে তা নিজেই জানিয়েছেন আজ। তার লিখাটি হুবহু পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো –

আম্মা হাসপাতালে। পনেরোদিন সেখানে কাটিয়ে মাত্র সপ্তাহখানেক আগে বাড়িতে ফিরেছিলেন। শরীরের অবস্থা খুব ভালো না হলেও বাড়ি ফিরতে পারার খুশী তাঁর চোখেমুখে দেখে আমাদের মনে কিছুটা শান্তি ফিরেছিল। কিন্তু আচমকা গতপরশু ভোরবেলাতে বুকে কাঁপন ধরানো ঘটনা ঘটে।ফোন করা হলো হাসপাতালের হটলাইন নাম্বারে। যিনি ফোন ধরলেন, বুঝলাম তার ঘুম নষ্ট করে খুবই অন্যায় করেছি। জানাই, আমার মা র এমন অবস্থা, এ্যাম্বুলেন্স দরকার। তিনি ধমকের ঢঙে একটা ফোন নাম্বার লিখতে বলেন।ফোন করে যাকে পাওয়া গেলো, বললাম ঠিকানা পাঠিয়ে দিচ্ছি, দয়া করে তাড়াতাড়ি আসার চেষ্টা করেন। পেশেন্টের অক্সিজেন কমে যাচ্ছে, অক্সিজেন সিলিন্ডার আনতে হবে আর নামাতে হবে চারতলা থেকে- স্ট্রেচার লাগবে।

– চারতলা থেকে নামাতে হলে বাড়তি টাকা দিতে হবে। ওপাশ থেকে মনে হলো কোনও মৃত মানুষের গলা শুনলাম।তারপর তারা এলো। এলো যন্ত্রের মতো নড়াচড়া করা দুজন মরা মানুষ। সাথে অক্সিজেন সিলিন্ডার নেই।

– অক্সিজেন আনেননি

– আছে, এ্যাম্বুলেন্সে আছে

– পেশেন্টকে অক্সিজেন ছাড়া নামানো যাবেনা। মৃতদের একজন কান চুলকায়

– ঐটা তো খুলে আনা যায়না। ঘরের মধ্যের আমরা সবাই অসহায়বোধ করি। আম্মাকে এর আগেও হাসপাতালে নেয়া হয়েছে, একই হাসপাতালের অন্য কর্মীরা অক্সিজেন সিলিন্ডার উপরে তুলে এনেছিল।সামনে আম্মা ছটফট করছেন আর ভিনজগত থেকে আসা দুই মৃত নির্বিকার। তারা পরষ্পরের মুখ দেখে। আমরা বিপদ আর অন্ধকার ঘন হয়ে আসতে দেখি। একজন মিনমিন করে জানায়

– অক্সিজেন সিলিন্ডার ভারী বলে উপরে আনা হয়নি। আগেই ধরে নিয়েছি এরা মানুষ ছিল, এখন মৃত। জেনে বুঝেও তাঁদের আচরণ, ভাষায় মাথায় আগুন ধরিয়ে দেয়, নামী হাসপাতালের পরিচয়পত্র তাঁদের গলায় ঝোলানো। পরিবারেরই একজন নীচে গিয়ে সিলিন্ডার বয়ে আনে, পিছন পিছন যায় আসে এ্যাম্বুলেন্সের চালক।হাসপাতালে পৌঁছে চালক এ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া মিটিয়ে দিতে বলে, সাথে নিজে তৈরি করে দেয়া একটা বিল দেয়। তাতে আটশত টাকা পরিশোধের কথা লেখা। আটশত টাকা কেনো?

প্রতি তলা নামানোর জন্য দুইশত টাকা হিসাব করে চারতলার জন্য আটশত টাকা।

খুবই সরল অংক। দুঃসময়ে অনুভব করা যায়, দেখা যায়, সরল অংক কষে শুধু নিজের প্রাপ্য বুঝে নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা মানুষের সংখ্যা সবখানে দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। এর কারণ রোধের চেষ্টা নেই। উপেক্ষা করে ভালো থাকার পথ বেছে নিয়েছে মানুষ। সে পথ আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে – ভাববার দরকার নেই, ভেবে ভালো থাকছে মানুষ।সবশেষে ঘটে অজস্র অসুস্থতার মধ্যে একমাত্র সুস্থ, স্বাভাবিক ঘটনা। একের পর এক ঘটে যাওয়া অস্বাভাবিকতার মধ্যে সে ঘটনাকে মনে হয় স্বপ্ন। তা স্বপ্ন ছিলনা। দীর্ঘদিন ধরে যে চিকিৎসক দল আম্মাকে চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন, তাঁদের একজন হাসপাতালে চতুর্থতলায় ছিলেন। অত ভোরে সেই তরুন ডাক্তার আম্মার অসুস্থতার কথা শুনে দ্রুত চলে আসেন জরুরী বিভাগে। তাঁর আসা এবং দায়িত্ব নেয়া দেখে মনে হলো, জগতে আলো ভালো, আশা সবই আছে। একদল মন দিয়ে অন্ধকার লেপছে জীবনের উপর আবার কিছু মানুষ রয়েছে – যারা কর্তব্যপালনই ধর্ম মনে করে।

এই হচ্ছে আমাদের বর্তমান।আমার দুঃখ, হতাশা, ক্রোধের কথা শুনে একজন বলে- এই দেশ ও মানুষের কাছে আমি বেশী আশা করি, সেটাই নাকি আমার কষ্টের প্রধান কারণ। দেশের কাছে, মানুষের কাছে আশা থাকবেনা- তেমন জীবন, বেঁচে থাকাকে কি সন্মানের বলা যায়?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here