যেভাবে জন্ম হলো আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো গানের (ভিডিও)

দেশের বিশিষ্ট সাংবাদিক, গীতিকার, কলামিস্ট ও সাহিত্যিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী বৃহস্পতিবার ভোর ৬টা ৪০ মিনিটে লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। তার মৃত্যুতে দেশব্যাপি শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর অনেক পরিচয় থাকলেও একটি গানই তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে সুদীর্ঘকাল, যত দিন বাংলাদেশ নামটি থেকে যাবে। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী দুর্দান্ত এক বর্ণাঢ্য জীবন কাটিয়ে গেলেন। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গানটির জন্যই অমর হয়ে রইবেন এই কীর্তিমান। গানটির পেছনের গল্প আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী তুলে ধরেছিলেন বাংলা একাডেমির একটি অনুষ্ঠানের বক্তব্যে। ―১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দুপুরে ঢাকার তৎকালীন প্রাদেশিক আইন পরিষদ ভবনের (বর্তমান জগন্নাথ হল) সামনে গুলি বর্ষণ করা হয়। শহীদ রফিকের লাশ পড়ে আছে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগের বারান্দায়। তার মাথার খুলি উড়ে গেছে গুলিতে। এই খবর শুনে গাফ্ফার চৌধুরী তার বন্ধুরা মিলে ছুটে যান হাসপাতালে। শহীদ রফিকের লাশ দেখে তার মনে শোকে-আবেগে গুঞ্জরিত হয় ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’। হাসপাতালের পাশে মেডিক্যাল কলেজের ব্যারাক-হোস্টেলের সামনে তখন ছাত্র-জনতার ভিড়। সে সময় গাফ্ফার চৌধুরীর সঙ্গে দেখা হয় তার এক বন্ধু সৈয়দ আহমদ হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানতে চান গাফ্ফার চৌধুরী কি মিছিলে ছিলেন? তখন তিনি বলছেন―হ্যাঁ ছিলাম। গুলি শুরু হতেই মেডিক্যাল হোস্টেলের ভেতর আশ্রয় নেই। এখন হাসপাতালের বহির্বিভাগের মেঝেতে একজন শহীদের মৃতদেহ দেখে এলাম। তাকে দেখে মনে হয়েছে, আমার আপন ভাই। মনে মনে একটি কবিতার লাইনও তৈরি হয়েছে―‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’। তখন কবিতার লাইনটি শুনে আহমদ হোসেন তার হাত চেপে ধরে বললেন, এই কবিতাটি এখনই লিখে ফেলুন। গাফ্ফার চৌধুরী বললেন, রাস্তায় দাঁড়িয়ে কি কবিতা লেখা যায়? হোস্টেলে ফিরে গিয়ে লিখব। তখন আহমদ হোসেন বললেন, আপনি হেঁটে আরমানিটোলা পর্যন্ত যেতে যেতে কবিতাটি হারিয়ে যাবে। আপনি আমার সাইকেলটা নিন, তাড়াতাড়ি হোস্টেলে গিয়ে কবিতাটি লিখুন। গাফ্ফার চৌধুরী তখন ঢাকা কলেজের ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র। এদিকে সরকারের নির্দেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য কলেজ ও ছাত্রাবাস বন্ধ করে দেওয়া হয়। জানানো হয়, রাতেই তাদের ছাত্রাবাস ছেড়ে যেতে হবে। গাফ্ফার চৌধুরী কাপড়চোপড় গোছানোর জন্য দোতলায় নিজের কক্ষে যান। তখন তার মনে হলো কবিতার কয়েকটি লাইন অন্তত লিখে রাখা দরকার। না হলে কবিতাটি মন থেকে হারিয়ে যাবে। টেবিলে বসে কবিতার পাঁচ-ছয় লাইন লিখে ফেললেন, বাকিটা আর তখন লেখা হয়নি তার। বেগম বাজারে ঢাকা কলেজের তখন আরেকটি ছাত্রাবাস ছিল, নাম―নুরপুর ভিলা। হোস্টেল সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন দর্শনের অধ্যাপক সাঈদুর রহমান। তারই ছেলে শফিক রেহমান। তিনি থাকেন হোস্টেলের গেস্ট হাউসের দোতলায়। ওই রাতে গাফ্ফার চৌধুরী শফিক রেহমানের কাছে গিয়ে উঠলেন। সেখানেই কবিতাটির আরো কিছু অংশ লেখা হলো। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি শোক র‌্যালিতে পুলিশের লাঠিচার্জে অনেকের সঙ্গে গাফ্ফার চৌধুরীও আহত হন, পায়ে মারাত্মক ব্যথা পান। তার সহপাঠী দাউদ খান মজলিশ তাকে নিয়ে যান বংশালে তার এক আত্মীয়ের বাসায়। সেই বাসার এক চিলেকোঠায় তিনি থাকতেন। সেখানে বসে একুশের কবিতাটি শেষ করার চেষ্টা করেন গাফ্ফার চৌধুরী। কিন্তু অসুস্থতার কারণে তা হয়ে ওঠেনি। এরপর তিনি ভর্তি হন ঢাকা মেডিক্যালে। সেখানে এসে আহমদ হোসেন জানতে চাইলেন―কবিতাটি লেখা শেষ হয়েছে? গাফ্ফার চৌধুরী বললেন, অর্ধেকের মতো হয়েছে। তখন আহমদ হোসেন তার হাত চেপে ধরে অনুরোধ করেন কবিতাটি আজই শেষ করে দিতে। আহমদ হোসেন তাকে কাগজ-কলম এগিয়ে দিয়ে বললেন, কবিতাটি এখনই শেষ করে দেন। অবশেষে গাফ্ফার চৌধুরী পুরো কবিতাটি লেখা শেষ করলেন। গানটিতে মোট ৩০ লাইন থাকলেও প্রভাতফেরির গান হিসেবে প্রথম ছয় লাইন গাওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৯ সালে জহির রায়হান তার ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমায় গানটি ব্যবহার করেন। একুশের এই গান আজ আর কেবল বাংলাদেশের গান নয়। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের ইউনেসকোর এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের ফলে প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে বিশ্বের ১৯৩টি রাষ্ট্রে গাওয়া হয় এই গানটি। ইংরেজি, হিন্দি, মালয়, ফরাসি, সুইডিশ, জাপানিসহ ১২টি ভাষায় গাওয়া হয় এই গান বিশ্বব্যাপি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here