শেষ বিদায়ে ভালোবাসায় সিক্ত মান্নান হীরা

0
349
শেষ বিদায়ে মান্নান হীরা

সংস্কৃতিজন আর নাট্যকর্মীরা ফুলেল শ্রদ্ধা আর অশ্রুসিক্ত নয়নে শেষ বিদায় দিলেন নাট্যকার, নির্দেশক, অভিনয়শিল্পী মান্নান হীরাকে। তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন তার জন্মস্থান সিরাজগঞ্জ জেলার রহমতগঞ্জের কাচারিপাড়া পারিবারিক গোরস্থানে।বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে নাট্যকার মান্নান হীরা মরদেহ নিয়ে আসা হয় শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা প্রাঙ্গণে। বাংলাদেশ পথনাটক পরিষদের ব্যবস্থাপনায় শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ।সাদাকালো ছবিতে দূরপানে চেয়েছিলেন মান্নান হীরা। তার পাশে লেখা, তারই কথা- “নাটক আমার বুকেরও ধন, নাটক আমার সোনার সন্তান/ নাটক আমার প্রিয় ভূমি, আমারো জীবন মরণ”। তার কথার মতোই তাকে স্মরণ করে নাট্যাঙ্গণের বিশিষ্টজনরা বললেন, মান্নান হীরা ছিলেন আপাদমস্তক একজন নাটকের মানুষ। মান্নান হীরাকে নানা ভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে।শ্রদ্ধা জানাতে এসে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ বলেন, আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র হারিয়ে গেলেন। তিনি বলেন, এই করোনাকালে আমরা আমাদের কত স্বজনকে হারালাম। আমি প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শোকবার্তা দিতে দিতে ক্লান্ত। আমার আর ভালো লাগে না।সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে নাটকের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে ফেলেছিলেন মান্নান হীরা। তাকে ছাত্র থেকে নাট্যকার হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন নাট্যজন মামুনুর রশীদ। প্রিয় অনুজকে হারিয়ে বেদনাতুর কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘মান্নান হীরা ছিলো আমার সন্তানের মতো। ছিলো বন্ধু, সহকর্মী। আমি আমার সন্তানকে হারিয়েছি, বন্ধুকে হারিয়েছি, যোগ্য সহকর্মীকে হারিয়েছি। শ্রেণী সংগ্রামের বিরুদ্ধে আরণ্যকের হাতিয়ার নাটক তার হাত ধরেই হয়েছে। তিনি বলেন, আমি বেদনাসিক্ত। কিন্তু আনন্দিত। আমার মান্নান হীরার জন্য সবার এই স্তুতি বাক্য আমাকে বেদনার মাঝেও আনন্দিত করছে। নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘পথনাটকের কথা বললে, যার কথা আমারা সবার আগে মনে করব তিনি মান্নান হীরা। মান্নান হীরা নাটকের মাধ্যমে তিনি সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরেছেন। প্রতিবাদী কন্ঠস্বর হিসেবে কাজ করেছেন। সমাজের জন্য যা বলা প্রয়োজনীয়, তা তিনি নাটকের মাধ্যমে বলেছেন।’নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, ‘তার কর্ম সাফল্য আমাদেরকে মঞ্চে ও রাজপথে যুগপতভাবে চালিত করেছেন। তার কর্ম সাফল্য ও ফলাফল আমাদেরকে উজ্জীবিত করেছে। অনন্তকাল ধরে আমরা তাঁর কর্মজীবনকে উদযাপন করতে চাই।’মঞ্চসারথি আতাউর রহমান বলেন, ‘মান্নান হীরা নাটক ছাড়া কিছু বুঝতেন না। আমরা আমাদের নাট্যাঙ্গনে এমন একজনকে হারালাম, যিনি আমাদের প্রাণের মানুষ ছিলেন।গণসঙ্গীত শিল্পী ফকির আলমগীর বলেন, ‘সাম্যবাদের লড়াকু সৈনিক হিসেবে আজীবন তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন।’পুলিশের ঢাকা বিভাগের ডিআইজি হাবিবুর রহমান বলেন, ‘যাদের প্রেরণায় পুলিশ নাট্যদল যাত্রা করেছে তাদের অন্যতম মান্নান হীরা। গত ২১ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তাঁর লেখা ও নির্দেশিত ‌’বাংলার কারবালা ‘নাটকের প্রিমিয়ার শো হয়েছে। তাঁর কাছে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু ছিল সবার উপরে।’শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক ও গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশানের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী লাকী বলেন, ‘মান্নান হীরা সারা দেশের শিল্প, সংস্কৃতি ও নাটকের যে উপকার করে গেছেন, এর জন্য আমরা আজীবন তাকে স্মরণ রাখবো।পথনাটক পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনরত পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আহম্মদ গিয়াস বলেন, ‘সামাজিক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংকটের সময় নিয়ে তিনি নাটক নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি তাঁর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি।গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক চন্দন রেজা বলেন, ‘মান্নান হীরা ছিলেন গণমানুষের নাট্যকার। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মৌলবাদবিরোধী অবস্থান তিনি নাটকের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন।’সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ টেলিভিশন, ডিরেক্টরস গিল্ড, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, গণসঙ্গীত সমন্বয় পরিষদ, আরণ্যক নাট্যদল, টেলিভিশন নাট্যকার সংঘ, বাংলাদেশ পুলিশ নাট্যদল, আইটিআই বাংলাদেশ কেন্দ্র, কণ্ঠশীলন, শিল্পকলা একাডেমি কর্মচারী ইউনিয়ন, ঢাকা থিয়েটার মঞ্চ, থিয়েটার, নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়, ঢাকা পদাতিক, দনিয়া সাংস্কৃতিক জোট, সময় নাট্যদল, মহাকাল নাট্য সম্প্রদায়, থিয়েটার আর্ট ইউনিট, দৃষ্টিপাত নাট্য সম্প্রদায়, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন, প্রাচ্যনাটসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে কার্পেট মসজিদে মান্নান হীরার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।গত বুধবার রাতে রাজধানীর একটি হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন নাট্যজন মান্নান হীরা। মান্নান হীরার জন্ম ১৯৫৬ সালে, সিরাজগঞ্জ জেলায়। মফস্বল শহর থেকে মাধ্যমিক, রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। নাট্যচর্চার শুরু থেকেই তিনি আরণ্যক নাট্যদলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মান্নান হীরা পথনাটক আন্দোলনের সঙ্গে আজীবন যুক্ত ছিলেন। পথনাটক পরিষদের সভাপতি ও আরণ্যক নাট্যদলের অধিকর্তা ছিলেন। তিনি মঞ্চ ও টিভির জন্য অসংখ্য নাটক লিখেছেন।তাঁর নাটকের প্রধান উপাদান নিরন্ন মানুষ ও দরিদ্র জনপদ। বিশেষ করে তার পথনাটক বিশাল কৃষিজীবী মানুষ, তাদের উৎপাদন ও উপকরণ কেন্দ্র করে লেখা। তীক্ষ্ণ সংলাপের ঘাত–প্রতিঘাতে মান্নান হীরার নাটক যেমন অভিনয় উপযোগী, তেমনি সুখপাঠ্য। প্রচ্ছন্ন রাজনীতিকে কেন্দ্রে রেখে প্রেম ও অন্যান্য সামাজিক সম্পর্ক আবর্তিত হয় তাঁর নাটকে। প্রথাগত সমাজ ও রাষ্ট্র কাঠামো ভেঙে ফেলতে অনুপ্রেরণা জোগায় তাঁর লেখা নাটক। নাটক লেকার পাশাপাশি তিন একাধারে ছিলেন নির্দেশক, নির্মাতা ও অভিনেতাও।তার উল্লেখযোগ্য নাটকের মধ্যে আছে- ‘লাল জমিন’, ‘ভাগের মানুষ’, ‘ময়ূর সিংহাসন’, ‘সাদা-কালো’। এছাড়াও ‘ক্ষুদিরামের দেশে’, ‘ফেরারী নিশান’, ‘আদাব’, ‘ঘুমের মানুষ’ ‘মৃগনাভি’, ‘শেকল’, ‘জননী বীরাঙ্গনা’, ‘মণিমুক্তা’, ‘একাত্তরের রাজকন্যা’, ‘মেহেরজান, ‘ফুটপাত’, ‘চন্দ্রমুখী’ প্রভৃতি তার উল্লেখযোগ্য নাটক। ‘মূর্খ লোকের মূর্খ কথা’ মান্নান হীরা রচিত ও নির্দেশিত অন্যতম পথনাটক। ২০১৪ সালে তিনি সরকারের অনুদানে শিশুতোষ চলচ্চিত্র ‘একাত্তরের ক্ষুদিরাম’ তৈরি করেন। এটি তার পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র। ‘গরম ভাতের গল্প’ ও ৭১-এর রঙপেন্সিল নামে দুটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রও পরিচালনা করেন তিনি।২০০৬ সালে মান্নান হীরা নাটক শ্রেণিতে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন।

লেখক – নিথর মাহবুব

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here