সিস্টেমের ঘাপলা সামলানোটাই ডিরেক্টর গিল্ডের প্রধান কাজ হোক

0
246


শিমুল সরকার :

ডিরেক্টর গিল্ডের নির্বাচন ২৬ ফেব্রুয়ারি।

বাংলাদেশের টেলিভিশন মিডিয়ার অস্তিত্ব রক্ষার ক্রান্তিকাল চলছে এখন। এই ক্রান্তিকালকে অতিক্রম করতে প্রয়োজন একটা শক্তপোক্ত নেতৃত্ব। কারা আসছেন সেই ম্যাজিক চেয়ারে? চেয়ারটা যাদুরই বটে। টেলিভিশন মিডিয়ার বর্তমান যে হাল তাতে পরিচালক স্বত্ত্বাটাই প্রশ্নের মুখে। একজন নির্মাতাকে যেখানে বলা হয় ক্যাপ্টেন অব দ্যা শিপ, সেখানে আমাদের দেশে সেই মহা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রটা হয়ে পড়েছে অনেকটা কীট পতঙ্গের মতো। একটা সমিতিই যে সবকিছু করতে পারবে সেটা আশা করাটাও ঠিক হবে না পুরোপুরি। মহা পরিবর্তন প্রয়োজন যা সম্মিলিতভাবেই করতে হবে।

আমাদের টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রি হয়ে পড়েছে তারকা নির্ভর। অভিনেতা অভিনেত্রীরাই এখানে ছড়ি ঘুরাচ্ছেন অবিরত। সেই সুযোগটা যে তারা দখল করেছেন তা কিন্তু নয়। সিস্টেমের ঘাপলা সেই সুযোগটা করে দিয়েছে। আপনি একটা টিভি চ্যানেলে যাবেন একটি নাটক নির্মাণ করে বা নাটকের প্রস্তাবনা নিয়ে, সেখানে আপনাকে প্রথম যে প্রশ্নটি করা হবে তা হলো কাস্টিং কে কে? পৃথিবীর আর কোনো দেশে এই প্রশ্নটা প্রথম প্রশ্ন হয় বলে আমার অন্তত জানা নেই। গল্প কি? নির্মাণের কোয়ালিটি কি? এসবকে ছুড়ে ফেলে যখন কাস্টিং হয়ে যায় প্রথম এবং প্রায় একমাত্র বিবেচনার বিষয় কিংবা কাস্টিং চাপিয়ে দেয়া হয় তুচ্ছ এবং হাস্যকর বাণিজ্যের অজুহাতে, তখন পরিচালক স্বত্ত্বাটাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

সত্যজিত রায়ের পথের পাঁচালীর বুড়ি ঠাকুরমা বা অপু কিন্তু কোনো তারকা ছিলেন না বা জীবনে আগে কখনও অভিনয়ও করেননি। গুপী গায়েন বাঘা বায়েন এর গুপী তার জীবনে সেই একটি চরিত্রেই অভিনয় করে দুনিয়াজোড়া খ্যাতি লাভ করেছেন। তারকা তৈরির কারিগরকে যখন পুতুল বানিয়ে ইচ্ছেমতো নাচানোর প্রবনতা ভয়ানকভাবে আবির্ভূত হয় তখন ইন্ডাস্ট্রি ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হবারই কথা। হয়েছেও তাই। টেলিভিশন মিডিয়া আজ মুখ থুবড়ে পড়েছে।

নিজেদের মান না বাড়িয়ে বিদেশী চ্যানেল বন্ধের মিছিলে আমরা বেশি সময় ব্যয় করছি। হাতে গোনা দুই তিনটি চ্যানেল বাদে বেশিরভাগ চ্যানেলের অবস্থা এতটাই নাজুক যা ভাষায় প্রকাশ করার উপায় নেই একবারেই। ইন্ডাস্ট্রির নাটাই এখন ইউটিউবের হাতে। প্রায় ৮০ ভাগ বিজ্ঞাপন বাজেট চলে যাচ্ছে ডিজিটাল প্লাটফর্মে, কারন আমাদের চ্যানেল কেউ দেখে না। তারকা চাপিয়ে নেয়া পুতুল হতে পারছেন যারা তারাই এখন পরিচালক হিসেবে রাজ করছেন। সম্প্রতি একটা খবর বেশ শোনা যাচ্ছে – একটি চ্যানেল ৯০ হাজার টাকায় এক ঘন্টার একটি নাটক বানিয়ে ৪ খন্ডে সেটি প্রচার করছে। বানাচ্ছেন কারা? ৯০ হাজার টাকায় কি একটি নাটক বানানো আদৌও সম্ভব? কি উদ্দেশ্য এইসব কর্মের? একটি চ্যানেল ৫/১০ হাজার টাকায় এক ঘন্টার নাটক খুঁজে বেড়ায় তাদের আলিশান অট্টালিকা সম্পন্ন চ্যানেলে প্রচারের জন্য। দেশের শিল্পের প্রতি দায়বোধ সবথেকে বেশি দাবি করা একটি চ্যানেল দুই লাখ টাকায় টেলিফিল্ম বানাচ্ছেন সপ্তাহে দুই তিনটি। অথচ একটি নাটক নির্মাণ এবং তার পিছনের এত এত কাজ এত স্বল্প অর্থে কোনোভাবেই সম্ভব হবার কথা নয়। কিন্তু হচ্ছে। কারা করছেন, বা করতে বাধ্য হচ্ছেন কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য, এটা দেখার দায় অতি অবশ্যই ডিরেক্টর গিল্ডের।

অনেক চ্যানেল নির্মাতাদের বকেয়া অর্থ না দিয়ে বছরের পর বছর তাদের প্রচার অব্যাহত রাখতে পারছেন কিভাবে সেটিও দেখার দ্বায়িত্ব এই অভিভাবক সংগঠনটির উপরেই বর্তায়। পরিচালক তারকা তৈরি করবেন, কখনওই ভোর বেলা কোনো মহা তারকার বাড়ির গেটে গিয়ে পেপার বিছিয়ে লাইনে বসবেন না দুইদিনের সিডিউল নামক সোনার হরিণ পাবার জন্য। এই ইন্ডাস্ট্রিটা যদি একটি জাহাজ মনে করি তাহলে সেই জাহাজের মালিক প্রযোজক এবং ক্যাপ্টেন হলেন পরিচালক যিনি মহা সমূদ্র পাড়ি দিয়ে জাহাজটি কিভাবে তীরে গিয়ে ভিড়বে সেই দ্বায়িত্বটি পালন করেন তার মেধা আর দক্ষতা দিয়ে যেখানে মালিকেরও হস্তক্ষেপ করার কোনো অপশন থাকে না বললেই চলে। সেখানে যদি সেই জাহাজের যাত্রী, চেয়ার টেবিল বা খাবার প্লেট, পানির গ্লাস ক্যাপ্টেনের উপরে ছড়ি ঘুরাতে আসে তাহলে সেই জাহাজ কখনওই তীরে নিরাপদে ভীড়তে পারার কথা নয়। হয়েছেও তাই। গভীর সমূদ্রে উদ্ধার দলের অপেক্ষায় আমাদের ইন্ডাস্ট্রি।

তারকা চাপিয়ে দেয়া, সিডিউল ফাঁসানো, যা ইচ্ছা সম্মানী চাওয়া, বকেয়া টাকা না দিয়ে দিব্যি চ্যানেল চালু রাখা, যখন ইচ্ছা সেটে গিয়ে যখন ইচ্ছা চলে যাবার ধৃষ্টতা বন্ধ করতে মাত্র ৭ দিন সময় লাগার কথা। এতোদিনেও সেটি হয়নি কারন আমরা আন্তরিকভাবে চাইনি। চাওয়াটা এবার হোক সেটাই প্রত্যাশা।

দুজন দক্ষ নির্মাতা বর্তমান দ্বায়িত্বে আছেন যাদের একজন বাংলাদেশের সবথেকে সফল ও জনপ্রিয় নির্মাতা সালাউদ্দিন লাভলু। হুমায়ূন আহমেদ চলে যাবার পর জনপ্রিয়তা এবং কাজের বিচারে তিনিই সেরা এই বিশ্বাস অনেকের মতো আমার নিজেরও। এবারও তিনি সভাপতি প্রার্থী। কোন ফোরামে সংগঠনকে উপস্থাপন করতে যে গ্রহনযোগ্য একটি মুখ প্রয়োজন হয় সেটি নিশ্চিতভাবেই তিনি হতে পারেন। তার গ্রহনযোগ্যতা, সম্মান, পরিচিতি সবকিছুই যে কোনো বিচারে প্রশ্নাতীত। সঙ্গে প্রয়োজন একজন দক্ষ, উদ্যমী, বাংলা সংস্কৃতিকে লালন করেন মনে এমন একজন সাধারন সম্পাদক, কারন ঘাপটি মেরে প্রতিক্রিয়াশীল, সাম্প্রদায়িক সহযোগীদের অনেকেই আমাদের ভিতরে ঢুকে বসে আছেন। সেই দিক থেকে আমার শতভাগ আস্থা এস এম কামরুজ্জামানের প্রতি। তার সাংগঠনিক দক্ষতা প্রশ্নাতীত। হয়ত তার নামের সাথে তারকাখ্যাতির ব্যাপারটা জড়িয়ে নেই। কিন্তু একটি সংগঠনকে পাল্টে দিতে তারকার একবারেই প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন একজন জীবন বাজি রাখা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মানুষ। আমি আস্থাবান হতে চাই এ ব্যাপারে তার প্রতি। যদিও কাজটি বিশাল এবং ব্যাপক। কিন্তু সদিচ্ছা থাকলে কাজটি একটি মুভমেন্টেই সম্ভব। সদিচ্ছাটা প্রয়োজন খুব করে। অন্য প্রার্থীদের প্রতিও শুভ কামনা রইলো।

বিশাল কোন নির্বাচনী ইশতেহার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। ইশতেহার এক লাইনেই বলে দেয়া যায় – একজন নির্মাতা একটি জাহাজের ক্যাপ্টেন এই সত্যটা বাস্তবায়ন করাটাই আমার নির্বাচনী ইশতেহার।
সফল হোক ডিরেক্টর গিল্ডের এবারের নির্বাচন।


(লেখক : নাট্যকার, নির্মাতা ও প্রযোজক)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here