কিংবদন্তি মোহাম্মদ রফি’র ডাক নাম ছিলো ফিকো (ভিডিও)

কিংবদন্তি মোহাম্মদ রফি'র ডাক নাম ছিলো ফিকো

উপমহাদেশের অত্যন্ত জনপ্রিয় ভারতীয় সঙ্গীতশিল্পী মোহাম্মদ রফি। ভারতীয় সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে একসময় সমগ্র উপমহাদেশে কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব ছিলেন মোহাম্মদ রফি। প্রায় চার দশক সঙ্গীত জগতে থাকাকালীন সময়ে তিনি ছাব্বিশ হাজারেরও অধিক চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়েছিলেন তিনি।

সঙ্গীতকলায় অসামান্য অবদান রাখায় শ্রেষ্ঠ গায়ক হিসেবে জাতীয় পদক এবং ৬ বার ফিল্মফেয়ার পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন গুণী এই সঙ্গীতশিল্পী। তিনি বহুবিধ গানে অংশ নেয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। তন্মধ্যে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, দেশাত্মবোধক গান, বিরহ-বিচ্ছেদ, উচ্চ মার্গের প্রেম-ভালোবাসা, কাওয়ালী, ভজন, গজলসহ বিভিন্ন গোত্রের গানে দক্ষতা ও পারদর্শীতা দেখিয়েছেন সমানভাবে। বিশেষ করে হিন্দি এবং উর্দু ভাষায় সমান দক্ষতা থাকায় তার গানগুলোতে বৈচিত্র্যতা এসেছে সমধিক।

১৯২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর তদানীন্তন ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাব এলাকার অমৃতসর গ্রামের কাছাকাছি কোটলার সুলতান সিংয়ে মোহাম্মদ রফি জন্মগ্রহণ করেন। তার ডাক নাম ছিল ফিকো। তার পিতার নাম হাজী আলী মোহাম্মদ। ভারতীয় সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে একসময় তিনি সমগ্র উপমহাদেশে অত্যন্ত জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন।

প্রথমে মোহাম্মদ রফি তার নিজ গ্রামে এক ফকিরের ভজন গানকে অনুকরণ করে গান গাওয়া শুরু করেন। জীবিকার সন্ধানে তার বাবা হাজী আলী মোহাম্মদ ১৯২০ সালে লাহোরে চলে যান এবং ভাট্টি গেটের নূর মহল্লায় একটি স্যালুনের মালিক হন। তার বড় ভাই মোহাম্মদ দ্বীনের বন্ধু আবদুল হামিদ লাহোরে অবস্থানকালীন সময়ে রফির প্রতিভা দেখে তাকে গান গাইতে সাহস জুগিয়েছিলেন। ১৩ বছর বয়সে রফি লাহোরের প্রথিতযশা শিল্পী কে. এল. সাইগলের (কুন্দনলাল সায়গল) সাথে জীবনের প্রথম দর্শক-শ্রোতাদের মুখোমুখি হয়ে কনসার্টে গান পরিবেশন করেন।

১৯৪১ সালে শ্যাম সুন্দরের পরিচালনায় গুল বালোচ ছবির মাধ্যমে সঙ্গীতে পেশাগতভাবে অভিষেক ঘটান রফি। পরের বছর বোম্বের চলচ্চিত্র গাও কি গৌরী ছবিতে নৈপথ্য গায়ক হিসেবে অভিষেক ঘটান। ১৯৪৪ সালে মোহাম্মদ রফি বোম্বেতে (বর্তমান মুম্বাই) চলে আসেন। সেখানে তিনি উস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খান, উস্তাদ আব্দুল ওয়াহিদ খান, পণ্ডিত জীবনলাল মত্তো এবং ফিরোজ নিজামী’র মতো প্রথিতযশা শিল্পীদের কাছ থেকে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তালিম নেন। প্রায় চার দশকের গানের ভুবনে অসাধারণ অবদানের জন্য মোহাম্মদ রফি সকল সময়ের, সকল কালের ও সকল বিষয়ের শিল্পী হিসেবে পরিগণিত হয়ে আছেন।

১৯৪৬ সালে মোহাম্মদ রফি দ্বৈত সঙ্গীতরূপে আনমল ঘড়িতে গান রেকর্ড করেন। বৈজু বাওরা (১৯৫২) ছবির গান হিসেবে – ও দুনিয়া কে রাখওয়ালে এবং মন তারপাত হরি দর্শন কো আজ রফি’র কণ্ঠকে অবিসংবাদিত তারকা খ্যাতি এনে দেয়।

মোহাম্মদ রফি তার সুদীর্ঘ সঙ্গীত জীবনে অনেক নামকরা সঙ্গীত পরিচালকের দিক-নির্দেশনায় বিভিন্ন ধরণের গান গেয়েছেন। তন্মধ্যে অমর সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে নওশাদের পরিচালনায়ই গান গেয়েছেন বেশী। এছাড়াও, ১৯৫০ এবং ১৯৬০ এর দশকে মোহাম্মদ রফি ও.পি. নায়ার, শঙ্কর জয়কিষাণ এবং এস.ডি.বর্মনের সুরেও অনেক গান গেয়েছেন। তিনি নওশাদের সহযোগিতায় অনেকগুলো গান গেয়েছেন।

১৯৪৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত শাহজাহান চলচ্চিত্রে কুন্দনলাল সায়গলের সাথে মেরে স্বপ্ন কি রানি, রুহী রুহী নামের কোরাসে অংশ নেন। মেহবুব খানের আনমল ঘড়ি (১৯৪৬)-তে ‘তেরা খিলোনা তোতা বালক’ এবং জুগনু (১৯৪৭) চলচ্চিত্রে ‘ইয়াহান বাদলা ওয়াফা কা’ গানে নূর জাহানের সাথে দ্বৈত সঙ্গীতে কণ্ঠ দেন।

নওশাদের দিক-নির্দেশনায় সর্বমোট ১৪৯টি সঙ্গীত পরিবেশন করেন মোহাম্মদ রফি। তন্মধ্যে তার সলো বা একক সঙ্গীত ছিল ৮১টি। ১৯৪৮ সালে মহাত্মা গান্ধী নিহত হবার পর হুসনলাল ভগতরাম-রাজেন্দ্র কৃষাণ-রফি ত্রয়ী একরাত্রিতেই কালজয়ী শুনো শুনো এই দুনিয়াওয়ালো, বাপুজী কি অমর কাহিনী গান রচনা করে সঙ্গীত পরিবেশন করেন। এরপর তিনি ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহ্‌রু’র আমন্ত্রণে গানটি পুণরায় পরিবেশন করে উপস্থিত সকলকে শোনান। ১৯৪৮ সালে ভারতের স্বাধীনতা দিবসে নেহরু’র কাছ থেকে রৌপ্য পদক গ্রহণ করেন মোহাম্মদ রফি।

১৯৪৯ সালে নওশাদ (চাদনী রাত, দিল্লাগী, দুলারী); শ্যাম সুন্দর (বাজার); হুসনলাল ভগতরামের (মীনা বাজার) প্রমূখ সঙ্গীত পরিচালকদের নির্দেশনায় একক সঙ্গীতে অংশ নেন। নওশাদের নির্দেশনায় শ্যাম কুমার, আলাউদ্দীন এবং অন্যান্যদের সঙ্গে রফি’র প্রথম গান ছিল ১৯৪৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত পেহলে আপ ছবির হিন্দুস্তান কি হাম হ্যায় গানটি। এভাবেই তিনি হিন্দী ভাষায় তার প্রথম গান রেকর্ড করেন। এছাড়াও রফি দু’টি হিন্দী ছবিতে অভিনয় করেন। ১৯৪৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত লায়লা মজনু চলচ্চিত্রের ‘তেরা জ্বালা জিস নে দেখা’ গানের দৃশ্যে অতিথি শিল্পী হিসেবে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

১৯৫০ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে বলিউডে অংশগ্রহণকারী অন্যান্য গায়কদের তুলনায় রফিকেই দেখা গিয়েছিল সবচেয়ে বেশী। এছাড়াও, হিন্দী ছবিতে তিনি অনেক খ্যাতনামা চলচ্চিত্র তারকার জন্যে গান গেয়েছেন। ১৯৬৫ সালে সঙ্গীত কলায় অসামান্য অবদান রাখায় ভারত সরকার তাকে পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত করেন।

১৯৭‌১-১৯৭৩ সময়কালের মধ্যে মোহাম্মদ রফি’র সঙ্গীত ভুবনে অংশগ্রহণ কমতে থাকে। তবে ১৯৭০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে রফি শীর্ষস্থানীয় কণ্ঠশিল্পী হিসেবে সঙ্গীত জগতে নিজের স্থান পুণরায় দখলে রাখেন। ১৯৭০ দশকের শেষ দিক থেকে ১৯৮০ দশকের শুরুর দিকে কণ্ঠসঙ্গীতে রফি’র স্মরণীয় অংশগ্রহণ ছিল। প্রাপ্ত তথ্য ও পরিসংখ্যান মোতাবেক ১৯৪৫ থেকে ১৯৮০ সময়কালের মধ্যে মোহাম্মদ রফি ৪,৫১৬টি হিন্দী ছবির গান, ১১২টি অন্যান্য চলচ্চিত্রের গান এবং ৩২৮টি অন্যান্য গান রেকর্ড করেছেন।

শুরুর দিকে ফিল্মফেয়ার কর্তৃপক্ষ শুধুমাত্র একজন কণ্ঠশিল্পীকে বছরের সেরা গায়ক নির্বাচিত করতো। ষাটের দশকে কিশোর কুমারকে টপকিয়ে তিনি সবচেয়ে বেশী (৬বার) এ পদক পেয়ে শীর্ষস্থানে ছিলেন। এ ছাড়াও মোহাম্মদ রফি ১৯৪৮: প্রধানমন্ত্রী জওহর লাল নেহরু’র কাছ থেকে ভারতের ১ম স্বাধীনতা দিবসে রৌপ্য পদক, ১৯৬৭: ভারত সরকার কর্তৃক পদ্মশ্রী পুরস্কার, ১৯৭৪: তেরী গালিও ম্যা না রাখেঙ্গে কদম আজ কে বাদ গানের জন্য ফিল্ম ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিনের পক্ষ থেকে সেরা গায়কের পুরস্কার এবং ২০০১: হিরো হোণ্ডা-স্টারডাস্ট ম্যাগাজিনের যৌথ উদ্যোগে ৭ জানুয়ারি, ২০০১ তারিখে অংশগ্রহণকারী পাঠকদের ৭০ শতাংশ ভোট পেয়ে তিনি শতাব্দীর সেরা গায়ক হিসেবে পুরস্কৃত হন।

১৯৮০ সালের ৩১ জুলাই মাত্র ৫৬ বছর বয়সে আকস্মিকভাবে হৃদজনিত সমস্যায় ভুগে উপমহাদেশের এই অমর সঙ্গীতশিল্পীর মহাপ্রয়াণ ঘটে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here